ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ১০:৪০:০০ AM

প্রশ্ন ফাঁস:প্রতারণার নতুন ডিজিটাল ফাঁদ

স্টাফ রিপোটার।। করাপশনমিরর.কম
08-07-2026 05:33:41 AM
প্রশ্ন ফাঁস:প্রতারণার নতুন ডিজিটাল ফাঁদ

পরীক্ষা শুরুর আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। এ সময় পরীক্ষার্থীদের চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে গভীর রাতে অসংখ্য শিক্ষার্থীর চোখ আটকে থাকে স্মার্টফোনের পর্দায়। তারা বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ ও টেলিগ্রাম চ্যানেলে তথাকথিত ‘প্রশ্ন ফাঁস’-এর খোঁজে সময় কাটায়। পরীক্ষার্থীদের এই মানসিক চাপ ও উদ্বেগকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে ওঠে একটি প্রতারক চক্র, যারা প্রশ্নপত্র দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। চলমান এইচএসসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও বসেছে প্রশ্ন ফাঁসের গুজবের ‘ডিজিটাল হাট’। বিশেষ করে ফেসবুকের পাশাপাশি এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড টেলিগ্রাম চ্যানেল ব্যবহার করে চক্রটি তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্ল্যাটফর্মে ভুয়া প্রশ্ন বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়ে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সূত্রে জানা গেছে, প্রশ্ন ফাঁস ও বিক্রির গুজব ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত একাধিক ফেসবুক গ্রুপ ও টেলিগ্রাম চ্যানেলের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় অন্তত ১৮টি অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। বর্তমানে সেগুলো সাইবার নজরদারির আওতায় রয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিদিন রাতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে। পাবলিক পরীক্ষা এলেই চক্রটি সক্রিয় হয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণা চালায়।

প্রতারণার কৌশল

‘এইচএসসি প্রশ্ন ফাঁস-২০২৬’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপে সদস্যসংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৮০০। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষদিকে গ্রুপটি ‘এসএসসি পরীক্ষা প্রশ্ন ফাঁস-২০২৬’ নামে চালু করা হয়। পরে ১১ মে এর নাম পরিবর্তন করে বর্তমান নাম রাখা হয়।

পরীক্ষার্থী পরিচয়ে যোগাযোগ করলে গ্রুপটির পরিচালকের পক্ষ থেকে ১২ জুলাইয়ের হিসাববিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্ন দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। বিনিময়ে দাবি করা হয় ৫ হাজার ৬০০ টাকা। পুরো টাকা দিতে অপারগতা জানালে ৫০০ টাকার বিনিময়ে একটি প্রশ্ন দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয় এবং একটি নগদ নম্বরে অর্থ পাঠাতে বলা হয়।

পরবর্তীতে ওই নম্বরের মালিকানা যাচাই করে জানা যায়, সেটি সুনামগঞ্জের বাসিন্দা ৫৪ বছর বয়সী কবীন্দ্র চন্দ্র দাসের নামে নিবন্ধিত। তবে তিনি জানান, তার নামে নিবন্ধিত হলেও নম্বরটি ব্যবহার করেন তার ছেলে এবং তার নিজের কোনো নগদ হিসাব নেই। এতে ধারণা করা হচ্ছে, নিবন্ধিত পরিচয় ব্যবহার করে অন্য কেউ প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।

ফেসবুক থেকে টেলিগ্রামে প্রলোভন

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ‘এইচএসসি প্রশ্ন ফাঁস-২০২৬’ গ্রুপে অন্তত সাতটি অ্যাকাউন্ট নিয়মিত প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়ায়। এর মধ্যে ‘আহমেদ রাহাত খান’ নামে একটি আইডি শিক্ষার্থীদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে। সেখানে নিয়ে গিয়ে প্রশ্ন দেওয়ার নামে অর্থ দাবি করা হয়।

একই গ্রুপে ‘ডারিয়া আক্তার’ নামের একটি আইডি থেকে প্রশ্ন পাওয়ার ভুয়া দাবি করে অন্যদের উৎসাহিত করা হয়। এছাড়া ‘জান্নাতুল ইসলাম’, ‘তানভীর চৌধুরী’, ‘রোমান ভাই’ ও ‘পিসফুলগ্রাপিফ্রুট’ নামের আরও কয়েকটি অ্যাকাউন্ট একই ধরনের প্রতারণামূলক প্রচারণায় জড়িত বলে জানা গেছে।

এছাড়া ‘এইচএসসি ব্যাচ ২০২৬ হেল্প লাইন’ নামের আরেকটি ফেসবুক গ্রুপেও একই কৌশলে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালে খোলা এই গ্রুপটি প্রথমে সাজেশনভিত্তিক কার্যক্রম চালালেও পরে একাধিকবার নাম পরিবর্তন করে বর্তমান পরিচয়ে পরিচালিত হচ্ছে। গ্রুপটি পরিচালনার সঙ্গে ‘ব্যতিক্রম অনলাইন কোচিং সেন্টার’ ও ‘টার্গেট এ প্লাস কোচিং সেন্টার’ নামে দুটি আইডির সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এখান থেকে ‘খুরশিদ বিন’, ‘প্যাশনিয়া টেলেম্মা৭৩১’ ও ‘সাদিকুল ইসলাম’ নামের অ্যাকাউন্টগুলো নিয়মিত প্রশ্ন বিক্রির প্রচারণা চালায়।

এ ছাড়া ‘রেজাল্ট চেঞ্জ’, ‘সকল বোর্ড প্রশ্ন ফাঁস’ এবং ‘এইচএসসি ব্যাচ-২০২৬’ নামের আরও কয়েকটি ফেসবুক গ্রুপ থেকেও একই ধরনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে।

ফেসবুকের পাশাপাশি ছয়টি টেলিগ্রাম চ্যানেলও সিআইডির নজরদারিতে রয়েছে। এসব চ্যানেলে প্রশ্ন ফাঁসের দাবি করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষের অবস্থান

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, এখন পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সুষ্ঠুভাবে বাকি পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের গুজব কেবল আর্থিক প্রতারণাই নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে এবং একটি গুরুতর সাইবার অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। তার মতে, ফেসবুক, টেলিগ্রাম বা অন্য কোনো মাধ্যমে প্রশ্ন বিক্রির দাবি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতারণার ফাঁদ।

তিনি সরকারের প্রতি সাইবার নজরদারি আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভুয়া প্রশ্ন বিক্রির সঙ্গে জড়িত অ্যাকাউন্ট, গ্রুপ ও চ্যানেল দ্রুত শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল ফরেনসিকের মাধ্যমে অপরাধীদের চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর সহযোগিতায় দ্রুত এসব কনটেন্ট অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

একই সঙ্গে তিনি সাধারণ মানুষকে প্রশ্ন ফাঁসের কোনো পোস্ট, লিংক বা বার্তা বিশ্বাস বা শেয়ার না করার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, গুজব ছড়ানো যেমন অপরাধ, তেমনি গুজবকে উৎসাহ দেওয়াও অপরাধকে শক্তিশালী করে।

সিআইডির অভিযান অব্যাহত

সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান আলী আকবর খান জানান, সংস্থার সাইবার পেট্রোলিং টিম সার্বক্ষণিকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করছে। কোনো ফেসবুক গ্রুপ বা টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রশ্ন ফাঁসের গুজব শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে বিটিআরসিকে জানানো হয়, যাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। পাশাপাশি এসব প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাকারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের অভিযানও অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন, সীমিত জনবল ও সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সিআইডি সাইবার অপরাধ দমনে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, জনসচেতনতা এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণই এ ধরনের প্রতারণা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।