ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ১২:১৪:২২ PM

ওয়াকার-উজ-জামান:নেতৃত্ব ও ৫ আগস্ট পরবর্তী ভূমিকা

মান্নান মারুফ
10-07-2026 10:43:25 AM
ওয়াকার-উজ-জামান:নেতৃত্ব ও ৫ আগস্ট পরবর্তী ভূমিকা

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান দেশের সামরিক নেতৃত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। দীর্ঘ সামরিক জীবনে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে পেশাদারিত্ব, নেতৃত্ব এবং প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ২০২৪ সালের ২৩ জুন তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৮তম সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস), সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) এবং সেনা সদর দপ্তরের সামরিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের জন্ম ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৬৬ সালে। তাঁর পৈতৃক নিবাস শেরপুর জেলায়। তিনি বাংলাদেশের ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজে উচ্চতর সামরিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে যুক্তরাজ্যের জয়েন্ট সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তিনি একজন দক্ষ ও পেশাদার সেনা কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

১৯৮৫ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কমিশন লাভ করেন। কর্মজীবনে তিনি একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন, একটি পদাতিক ব্রিগেড এবং একটি পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি সেনা সদর দপ্তর, স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিকস এবং সামরিক সচিবের শাখায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অ্যাঙ্গোলা ও লাইবেরিয়ায় সিনিয়র অপারেশন অফিসার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতাও তাঁর পেশাগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং দেশে অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি শান্তি, সংযম এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে একটি অন্তর্র্বতীকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়ার কথা ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বতীকালীন সরকার গঠিত হয়।

৫ আগস্টের ঘটনায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে ইতিবাচক মূল্যায়ন রয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষক ও সাধারণ নাগরিকের মতে, তিনি সংকটময় সময়ে বিচক্ষণতা, ধৈর্য এবং দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেন। তাঁদের মতে, সেনাবাহিনীকে সংযত থাকার নির্দেশ এবং জননিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে পরিস্থিতি আরও অবনতির ঝুঁকি কমে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণভাবে এগিয়ে যায়। তবে এ বিষয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে এবং ঘটনাগুলোর মূল্যায়ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সম্পর্কে তাঁর সমর্থকদের মধ্যে একটি ধারণা রয়েছে যে তিনি সততা, দেশপ্রেম এবং মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের মতে, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের নিরাপত্তা রক্ষাকে তিনি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁরা মনে করেন, সংকটের মুহূর্তে তাঁর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রচেষ্টা একজন বিচক্ষণ সামরিক নেতার পরিচয় বহন করেন।

অন্যদিকে, তাঁর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের কিছু অংশ তাঁর কয়েকটি সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফলে তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশংসা ও সমালোচনা—উভয় ধরনের মূল্যায়ন বিদ্যমান।

ব্যক্তিগত জীবনে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের স্ত্রী বেগম সারাহনাজ কমলিকা। তাঁদের দুই কন্যা রয়েছে। তিনি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমানের জামাতা। তবে তাঁর পেশাগত পরিচয় মূলত দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং দায়িত্ব পালনের ভিত্তিতেই মূল্যায়িত হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল নূরউদ্দিন খান, জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমানসহ একাধিক সেনাপ্রধান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সম্পর্কেও অনেক মানুষ ইতিবাচক মূল্যায়ন করেন এবং তাঁকে দক্ষ ও অভিজ্ঞ সেনাপ্রধান হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে কে সবচেয়ে সফল বা শ্রেষ্ঠ সেনাপ্রধান—এ বিষয়ে কোনো সরকারি বা সর্বজনস্বীকৃত র‌্যাঙ্কিং নেই; এটি ইতিহাসবিদ, গবেষক এবং সাধারণ মানুষের মূল্যায়নের বিষয়।

সব মিলিয়ে, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বাংলাদেশের একজন অভিজ্ঞ ও পেশাদার সামরিক কর্মকর্তা। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করেছেন এবং দেশের সামরিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সংকটের সময় তাঁর ভূমিকা দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়েছে। তাঁর নেতৃত্ব সম্পর্কে ইতিবাচক মূল্যায়নের পাশাপাশি সমালোচনাও রয়েছে। ভবিষ্যতে তাঁর অবদান ও নেতৃত্বের চূড়ান্ত মূল্যায়ন ইতিহাস, গবেষণা এবং সময়ের নিরপেক্ষ বিচারের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে।