ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা নিয়ে দলটির অভ্যন্তরে নতুন করে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র দাবি করেছে। এসব সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ইচ্ছার কথা শেখ হাসিনা প্রকাশ করার পর বিদেশে অবস্থানরত দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিমুখী হয়েছেন। সেখানে শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠকে দেশে ফেরার রূপরেখা, আইনি প্রস্তুতি, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে দলীয় সূত্রগুলোর দাবি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। এরপর দলের বহু কেন্দ্রীয় নেতা দেশ ত্যাগ করেন। তারা ভারতের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান নেন। প্রায় দুই বছর পর শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার ঘোষণা ঘিরে দলের অভ্যন্তরে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। দলীয় সূত্রগুলোর মতে, এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের একটি অংশ আবারও ভারতের দিকে ঝুঁকছেন।
গত ১০ জুলাই আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। একই সঙ্গে তিনি বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদেরও দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার আহ্বান জানান। তবে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা দাবি করেছেন, বিষয়টি কেবল রয়টার্সে সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর শুরু হয়নি। তাদের ভাষ্য, গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত কয়েকটি অভ্যন্তরীণ অনলাইন বৈঠকের পর থেকেই ডিসেম্বরকে সামনে রেখে নতুন পরিকল্পনার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং বিদেশে অবস্থানরত অনেক নেতা আগেই দিল্লিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন।
দলীয় সূত্রের দাবি, সম্প্রতি কলকাতা থেকে নয়াদিল্লির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন আওয়ামী লীগের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন দলের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। পরে কলকাতায় যান এবং সেখান থেকে দিল্লিতে গেছেন বলে সূত্রের দাবি।
একইভাবে সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার শ ম রেজাউল করিমও লন্ডন থেকে কলকাতায় এসে অবস্থান করছিলেন। দলীয় সূত্র বলছে, শেখ হাসিনার আহ্বানে তিনিও দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা করেছেন।
আগামী সপ্তাহে যুক্তরাজ্য থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে সুনামগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রণজিত সরকার, হবিগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. আবু জাহির এবং সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিধান কুমার সরকারের। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ ইতোমধ্যে কানাডা থেকে দিল্লিতে পৌঁছেছেন বলেও দলীয় সূত্র দাবি করেছে।
এ ছাড়া সাবেক মন্ত্রী আবদুর রহমান, সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সাবেক হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এবং সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ারও দিল্লিতে যাওয়ার প্রস্তুতির কথা বিভিন্ন দলীয় সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত নারায়ণগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানও দিল্লিতে যেতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। তবে দলীয় সূত্রের দাবি, তার দেশে ফেরার সম্ভাবনা আপাতত কম।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করলেও শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার পরিকল্পনায় তারা কতটা সম্পৃক্ত থাকবেন, সে বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। তবে তারা দেশে ফেরার বিষয়ে এখনো কোনো প্রকাশ্য অবস্থান নেননি।
একইভাবে শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শেখ হেলাল উদ্দিন, শেখ তন্ময়, নসরুল হামিদ, অসীম কুমার উকিল, অধ্যাপক অপু উকিল, শাহীন চাকলাদার এবং যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ভারতের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। তবে তাদের অনেকেই দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের বিষয়ে এখনো আগ্রহ দেখাননি বলেও সূত্রগুলোর দাবি।
দলীয় সূত্র আরও জানিয়েছে, সাবেক উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম, সাবেক হুইপ সানজিদা খানম এবং আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। অন্যদিকে চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে। পর্যায়ক্রমে তাদের কয়েকজনও ভারতে যেতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।
শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আইনি, প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক বিষয় সমন্বয়ের লক্ষ্যে একটি বিশেষ আইনজীবী দল গঠনের চিন্তাভাবনা চলছে বলে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। ওই দলে ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং শ ম রেজাউল করিম থাকতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশেষ করে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্বও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার ওপর অর্পণ করা হতে পারে বলে সূত্রের দাবি।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার পক্ষে একজন আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, গণমাধ্যমে গ্রহণযোগ্যতা এবং দলীয় গ্রহণযোগ্যতার বিষয় বিবেচনায় রেখে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
সাংগঠনিক পুনর্গঠনও আওয়ামী লীগের বর্তমান অগ্রাধিকারগুলোর একটি বলে দলীয় নেতারা জানিয়েছেন। বিভিন্ন সাংগঠনিক পর্যায়ে নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হচ্ছে এবং যেসব নেতা মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন, তাদের নেতৃত্বে আনার চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি নতুন কমিটিতে কারাগারে থাকা কিংবা জামিনে মুক্ত হওয়া নেতাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্র দাবি করেছে।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক উপকমিটির সদস্য রোকেয়া প্রাচীকে দিল্লিতে ডাকা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। একইভাবে প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের মেয়ে এবং মহিলা আওয়ামী লীগের মা ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক এস আমরিন রাখী, সাংগঠনিক সম্পাদক ঝর্ণা বারুই এবং খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অপু ত্রিপুরাও দিল্লিতে গেছেন বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রের ভাষ্য, গত কয়েক মাসে শেখ হাসিনা দিল্লিতে প্রায় দুই শতাধিক নেতার সঙ্গে পৃথক বা ছোট পরিসরে বৈঠক করেছেন। লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টোসহ বিভিন্ন শহরে অবস্থানরত নেতারাও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে যে কোনো সরকারের ভুল হতে পারে। তবে তার সরকারের ভালো-মন্দের চূড়ান্ত মূল্যায়নের অধিকার জনগণের। তিনি আরও বলেন, তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও কিংবা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়া হলেও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ রাখা উচিত নয়; দলটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার জনগণেরই। একই সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে অনলাইনের মাধ্যমে দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেছেন।
তবে শেখ হাসিনার ঘোষণার বাস্তবায়ন নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেতরেই ভিন্নমত রয়েছে। একাংশের মতে, দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন আস্থা তৈরির একটি রাজনৈতিক বার্তা। অন্য অংশের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনি বাস্তবতায় এই পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত, তা এখনো অনিশ্চিত। তাদের প্রশ্ন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেও তার সঙ্গে কতজন শীর্ষ নেতা একই ধরনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত থাকবেন, সেটি সময়ই বলে দেবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের আলোচনায় ভারতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাদের মতে, বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের একটি অংশের দিল্লিমুখী হওয়ার প্রবণতার পেছনে ভৌগোলিক সুবিধার পাশাপাশি রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং যোগাযোগসংক্রান্ত বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ বিষয়ে ভারত সরকার এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য বা অবস্থান প্রকাশ করেনি।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার ঘোষণা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে নতুন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতার জন্ম দিয়েছে বলে দলীয় সূত্রগুলোর দাবি। তবে ঘোষিত পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, দেশে ফেরার পথ কতটা সুগম হবে এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ কীভাবে নিজেদের পুনর্গঠন করবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।