দিনের প্রখর রোদ আর রাতের ভ্যাপসা গরমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জামালপুরের জনজীবন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র লোডশেডিং, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। তবে এই বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যেও দেখা দিয়েছে চরম বৈষম্যের অভিযোগ। একদিকে সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন অবস্থায় অসহনীয় গরমে কষ্ট পাচ্ছেন, অন্যদিকে জেলা শহরের অধিকাংশ সরকারি দপ্তরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) কক্ষে স্বাভাবিকভাবেই চলছে দাপ্তরিক কার্যক্রম। আর এই বৈষম্যের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষ এবং জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের রোগীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা শহরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা। বাকি সময় লোডশেডিংয়ে অন্ধকারে কাটাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। রাতের বেলায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় অবস্থা আরও নাজুক। অনেক গ্রামে দিনে মাত্র ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে। ফলে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে, ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে এবং শিক্ষার্থীদের লেখাপড়াও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে জেলা শহরের সরকারি দপ্তরগুলোতে লোডশেডিংয়ের প্রভাব কার্যত নেই বললেই চলে। সেখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে এসি ও ফ্যান চালিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করছেন কর্মকর্তারা। বাইরে যখন সাধারণ মানুষ অসহনীয় গরমে অতিষ্ঠ, তখন সরকারি অফিসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।
শহরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “গরমে দোকানে বসে থাকা যায় না। বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসা একেবারে লাটে উঠেছে। অথচ সরকারি অফিসে গেলে দেখি এসি চালিয়ে আরামে কাজ করছেন কর্মকর্তারা। তাদের অফিসে যদি বিদ্যুৎ থাকতে পারে, তাহলে আমাদের এলাকায় কেন থাকে না? এই বৈষম্য দেখার কি কেউ নেই?”
একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গৃহিণী রহিমা বেগম। তিনি বলেন, “সারা রাত বিদ্যুৎ থাকে না। গরমে বাচ্চারা ঘুমাতে পারে না। সকালে ক্লান্ত শরীর নিয়ে স্কুলে যেতে হয়। সব কষ্ট যেন শুধু সাধারণ মানুষের জন্য।”
বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে। জেলার প্রধান এই সরকারি হাসপাতালে নিয়মিত লোডশেডিংয়ের কারণে রোগী ও তাদের স্বজনদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ২৫০ শয্যার এই গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালে সাধারণ রোগীদের জন্য কার্যকর কোনো কেন্দ্রীয় বিকল্প বিদ্যুৎব্যবস্থা নেই। একটি জেনারেটর থাকলেও বিদ্যুৎ চলে গেলে সেটি মূলত চিকিৎসকদের কক্ষ এবং সীমিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চালু রাখা হয়। ফলে অধিকাংশ ওয়ার্ড মুহূর্তেই অন্ধকারে ডুবে যায়।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু ওয়ার্ডের রোগীরা। আট মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আসমা বেগম বলেন, “বাচ্চার এমনিতেই শ্বাসকষ্ট। বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো ওয়ার্ড অন্ধকার হয়ে যায়, গরমে দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা হয়। নেবুলাইজারের মেশিন বন্ধ হয়ে যায়। হাতপাখা দিয়ে বাতাস করেও বাচ্চাকে শান্ত রাখা যায় না।”
মেলান্দহ থেকে আসা রোগীর স্বজন জহুরুল ইসলাম বলেন, “রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে বসে থাকতে হয়। গরমে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়ার উপক্রম হয়।”
একই অবস্থা হাসপাতালের ১০ শয্যার হাম আইসোলেশন কর্নারেও। ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ শিশু সেখানে চিকিৎসাধীন থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকায় জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহারে বিঘ্ন ঘটছে। এতে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্বজনদের।
জেলার বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন জামালপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মো. সাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, “পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় গ্রাহক সংখ্যা ৭ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি। এই গ্রাহকদের চাহিদা পূরণে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে আমরা পাচ্ছি মাত্র ৫০ থেকে ৬০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এ কারণেই ব্যাপক লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।”
শহরাঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জামালপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহিবুল আজাদ রুবেল বলেন, “শহর এবং তিনটি উপজেলার আওতায় আমাদের গ্রাহক প্রায় ৭৮ হাজার। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে জাতীয় গ্রিড থেকে ২০ থেকে ২২ মেগাওয়াট পাওয়া যাচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ বাড়লে সংকট অনেকটাই কেটে যাবে।”
অন্যদিকে হাসপাতালের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মাহফুজুর রহমান সোহান বলেন, “২৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও বর্তমানে ৮০৭ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। অতিরিক্ত গরম এবং বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে সমস্যা তৈরি হয়েছে। আমাদের নিজস্ব জেনারেটর রয়েছে, তবে জ্বালানি ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে সার্বক্ষণিক চালু রাখা সম্ভব হয় না। তাই রোগীদের প্রয়োজন বিবেচনা করে রেশনিং পদ্ধতিতে চালানো হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, “শিশু ওয়ার্ড ও এসএনসিইউ (স্ক্যানো) ইউনিটে আইপিএস সুবিধা রয়েছে। এছাড়া হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডেও জেনারেটর সংযোগ চালু আছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ওয়ার্ডেও জেনারেটরের আওতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।”
জামালপুরের চলমান বিদ্যুৎ সংকট শুধু জনজীবন নয়, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, সীমিত বিদ্যুৎ সরবরাহের মধ্যেও যদি সরকারি দপ্তরগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে অন্তত হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকায় ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা উচিত। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি লোডশেডিং ব্যবস্থাপনায় বৈষম্য দূর করে জনদুর্ভোগ কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।