চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী ও সাবেক অথরাইজড অফিসার-১ মোহাম্মদ হাসানকে ঘিরে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি মামলা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং দায়িত্ব থেকে অপসারণের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি অর্থের অনিয়ম এবং নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে সিডিএর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা, প্রশাসনিক কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একাধিক মামলার আসামি থাকা অবস্থায় মোহাম্মদ হাসান দীর্ঘদিন সিডিএর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল ছিলেন। পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং সর্বশেষ অথরাইজড অফিসার-১ এর দায়িত্ব থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে, বিচারাধীন মামলার একজন আসামি কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও অনুমোদন-সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালন করেছেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে মোহাম্মদ হাসানের বিরুদ্ধে বিশেষ দুর্নীতি মামলা নম্বর ৪০/২০১২, ৪১/২০১২ এবং ৪৩/২০১২ বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, দায়িত্বে অবহেলা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদক ২০১০ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ ২৮ হাজার ৪৫২ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে একাধিক মামলা দায়ের করে। তদন্ত শেষে ২০১২ সালের মে মাসে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছিলেন।
চান্দগাঁও থানায় দায়ের করা এসব মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা যুক্ত করা হয়। বর্তমানে মামলাগুলো বিচারাধীন রয়েছে এবং অভিযুক্তরা আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মামলাগুলো চলমান থাকা সত্ত্বেও মোহাম্মদ হাসান সিডিএর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। একপর্যায়ে তিনি অথরাইজড অফিসার-১ পদে দায়িত্ব পান। সিডিএর এই পদটি ভবনের নকশা অনুমোদন, সংশোধিত নকশা, তলা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন নির্মাণ অনুমোদন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।
সিডিএর কয়েকজন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিযোগ, বিগত সরকারের সময়ে ভবন অনুমোদন ও উন্নয়ন কার্যক্রম ঘিরে একটি প্রভাবশালী প্রশাসনিক বলয় তৈরি হয়েছিল। তাদের দাবি, ওই সময়ে কিছু ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘন, অনুমোদনের বাইরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ কিংবা নকশা পরিবর্তনের ঘটনায় প্রশাসনিকভাবে শিথিলতা দেখানো হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সিডিএ চেয়ারম্যান এবং চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালামের দায়িত্বকালেও কিছু কর্মকর্তা প্রশাসনিকভাবে প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন। সমালোচকদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কয়েকজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার সুযোগ পেয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা আদালতের কোনো রায় পাওয়া যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোহাম্মদ হাসানকে নিয়ে সমালোচনা শুরু হওয়ার পর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে অথরাইজড অফিসার-১ এর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। তার স্থলাভিষিক্ত হন নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী কাদের নেওয়াজ।
এর আগে ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর সিডিএ চাকরি প্রবিধানমালার ৪০(ঙ) ধারা অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সিডিএ সচিব রবীন্দ্র চাকমা স্বাক্ষরিত অফিস আদেশের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।
প্রশাসনিক সূত্র জানায়, বহদ্দারহাট কাঁচাবাজার এলাকায় একটি মসজিদের বহুতল ভবনের অনুমোদন সংক্রান্ত জটিলতাও তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অসন্তোষের একটি কারণ হিসেবে আলোচিত হয়েছে।
দুদকের মামলায় মোহাম্মদ হাসান ছাড়াও সিডিএর একাধিক বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা অভিযুক্ত রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নাম রয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারাও এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, অতীতে ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে রয়েছে, তাদের বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে বিচারাধীন মামলার আসামি হয়েও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল থাকার ঘটনা সিডিএর প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরেছে। তারা মনে করেন, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, বিচারিক প্রক্রিয়ার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে নগর উন্নয়ন সংস্থাটির প্রতি মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে।