নারী সংক্রান্ত কেলেঙ্কারি, ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতি এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে মারাত্মক প্রতারণার অভিযোগে ‘বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’-এর সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম মিন্টুকে চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত (টারমিনেট) করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের গণমাধ্যম পাড়ায় এটি অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
ভাওতাবাজি ও বিভ্রান্তিকর তথ্যে সম্পাদক পদ দখল
অভিযোগ রয়েছে, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী পরিস্থিতিতে এক ধরনের অসৎ ও প্রতারণামূলক কৌশলের আশ্রয় নেন তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী পরিচালিত বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম-এ প্রথমে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে তিনি যোগদান করেন। তবে যোগদানের মাত্র দুই মাসের মাথায় অভ্যন্তরীণ চক্রান্তের মাধ্যমে তৎকালীন সম্পাদক লুৎফুর রহমান হিমেলকে সরিয়ে নিজেই ভারপ্রাপ্ত থেকে পূর্ণাঙ্গ সম্পাদকের পদ গুছিয়ে নেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানে তার একচ্ছত্র আধিপত্য ও খামখেয়ালিপনা শুরু হয়।
প্রশাসনিক অস্থিরতা ও কর্মী হয়রানি
সম্পাদক হওয়ার পর মিন্টুর প্রথম লক্ষ্য ছিল প্রতিষ্ঠানের পুরনো ও অভিজ্ঞ কর্মীদের ছাঁটাই করে নিজের বলয় তৈরি করা। তিনি ডিজিটাল বিভাগের কয়েকজনকে মূল রিপোর্টিংয়ে আনেন, আবার পেশাদার সাংবাদিকদের ডেস্কে পাঠিয়ে দেন। এমনকি রাতারাতি কয়েকজন আলোকচিত্রীকে রিপোর্টার বানিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে।
এছাড়া, বাংলাদেশে প্রচলিত অনলাইন গণমাধ্যমের ধারার বাইরে গিয়ে প্রতিদিন সকাল ১০টা এবং সন্ধ্যা ৬টায় বাধ্যবাধকতামূলক ভিডিও কলে মিটিং ও বায়োমেট্রিক হাজিরা চালুর মাধ্যমে কর্মীদের ওপর মানসিকভাবে নির্যাতন চালানো হয়। অথচ তার নিজস্ব পছন্দের বলয়ের জন্য এসব নিয়ম শিথিল ছিল। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এসব নিয়মের কারণে একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে অনেক অভিজ্ঞ সাংবাদিক প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করেন।
তারেক রহমানের নাম ভাঙিয়ে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাৎ
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু সবচেয়ে বড় প্রতারণাটি করেছেন ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষের সঙ্গে। নিয়োগের পূর্বে ও পরে তিনি মালিকপক্ষকে বিশ্বস্ততার সাথে বোঝান যে, লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বৈঠক হয়েছে এবং সরকারের সঙ্গে এই শিল্পগোষ্ঠীর সম্পর্ক মধুর করতে তিনি বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন। তার এই চটকদার কথায় প্রলুব্ধ হয়ে মালিকপক্ষ প্রথমে তাকে বিশ্বাস করে। তবে পরবর্তীতে কথার সঙ্গে কাজের কোনো মিল না পাওয়ায় তাদের ভুল ভাঙে। এরই মধ্যে বিভিন্ন কাজ গুছিয়ে দেওয়ার অজুহাতে তিনি মালিকপক্ষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।
অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ভুয়া নিয়োগ বাণিজ্য
অনলাইন পোর্টালটিতে জনবল সংকটের অশুভ অজুহাত দেখিয়ে তিনি একাধিকবার নতুন নিয়োগের অনুমোদন নেন। নিয়ম অনুযায়ী লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হলেও, বোর্ডের সুপারিশ করা যোগ্য প্রার্থীদের কাউকেই তিনি নিয়োগ দেননি। কারণ, সুপারিশকৃতদের মধ্যে তার পছন্দসই কেউ ছিল না। পরবর্তীতে সময়ক্ষেপণ করে নিয়োগ বোর্ডের অগোচরে পাঁচজন জ্যেষ্ঠ কর্মীকে নিয়োগ দেন, যাদের নাম বাছাই তালিকার কোথাও ছিল না। গুঞ্জন রয়েছে, অনৈতিক আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে এই নিয়োগগুলো দেওয়া হয়েছে। এসব নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ভাবমূর্তি সংকটে থাকা বিতর্কিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভূক্ত করায় গণমাধ্যমটির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে ওঠে।
ব্লাকমেইলিং ও সংবাদ সরানোর বিনিময়ে ঘুষ
শুধু অভ্যন্তরীণ অনিয়মই নয়, বাইরেও চাঁদাবাজির রমরমা ব্যবসা ফেঁদেছিলেন তিনি। রাজধানীর একটি নামী ফার্মাসিউটিক্যাল গ্রুপের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের পর তা মুছে ফেলার বিনিময়ে বড় অঙ্কের রফাদফার খবর বেরিয়ে আসে। মহাখালী ও গুলশান এলাকার একটি হোটেলে বৈঠক করে প্রায় ৩০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। যদিও মালিকপক্ষকে তিনি জানিয়েছিলেন, উক্ত প্রতিষ্ঠানটি কেবল বিজ্ঞাপন দেবে। সেই মোটা অঙ্কের টাকার কোনো হিসেব তিনি প্রতিষ্ঠানে জমা দেননি।
নির্বাচনের নামে তহবিল তছরুপ
রাজনৈতিক সুবিধা নিতে মিন্টু নিজেকে সাবেক ছাত্রদল নেতা ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিতেন। এই পরিচয়ের ওপর ভর করে তিনি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেন। এ উদ্দেশ্যে গ্রুপের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে নির্বাচনী ব্যয় বাবদ ৫ লাখ টাকা অনুমোদন করান। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও অনুদান সংগ্রহ করেন। অথচ নির্বাচনে ৫০ হাজার টাকাও খরচ না করে পুরো টাকা নিজের পকেটে পুরেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচনে বিশাল ব্যবধানে হেরে গেলেও নির্বাচনী তহবিল তছরুপের কারণে তার কোনো আক্ষেপ ছিল না।
নৈতিক অবক্ষয় ও নারী কর্মীদের ওপর নিপীড়ন
তৌহিদুল ইসলাম মিন্টুর ব্যক্তিগত জীবন ও চরিত্র নিয়ে মিডিয়া পাড়ায় দীর্ঘদিন ধরেই নানা গুঞ্জন ছিল। সকালে শরীরচর্চার নামে একটি ইয়োগা সেন্টারে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার সময় এক নারীর সঙ্গে তার অনৈতিক ঘনিষ্ঠতার কথা প্রকাশ পায়। সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় দিনে-দুপুরে এক নারীর সঙ্গে অনৈতিক অবস্থায় স্থানীয়দের হাতে তিনি অবরুদ্ধ হন। পরে প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল বিভাগের এক কর্মীকে পাঠিয়ে ৬০ হাজার টাকা ডেমারেজ (বিকাশ ও এটিএমের মাধ্যমে) দিয়ে সে যাত্রা রক্ষা পান।
এছাড়া, নিজ কার্যালয়ের নারী কর্মীদের তিনি প্রতিনিয়ত টার্গেট করতেন। অফিসের কাজের ছুতোয় এক নারী রিপোর্টারকে রিসোর্টে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হোয়াটসঅ্যাপে আপত্তিকর মেসেজ পাঠানোর প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে (ভাইরাল হয়)। কথা না শোনায় শেষ পর্যন্ত ওই নারী কর্মীকে বেআইনিভাবে চাকরিচ্যুতও করেন তিনি।
যেভাবে পতন ও বিদায়
নিজের অপকর্ম ও অনিয়ম ঢাকতে বিদায়ের ঠিক আগ মুহূর্তে মিন্টু রিপোর্টিং ও ফটোগ্রাফি বিভাগের কর্মীদের প্রশংসাপত্র দিয়ে তা ফেসবুকে শেয়ার করার নির্দেশ দেন, যাতে মালিকপক্ষ মনে করে কর্মীরা তার ওপর সন্তুষ্ট। তবে ততক্ষণে তার সব অপকর্মের নথি মালিকপক্ষের হাতে পৌঁছে যায়।
গত বুধবার সকালে মালিকপক্ষ তাকে সরাসরি ডেকে পাঠিয়ে পদত্যাগের নির্দেশ দেয়। সে সময় তিনি নানা অজুহাত দেখানোর চেষ্টা করলেও কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। শেষ পর্যন্ত বরখাস্তের পর নিভৃতে, কারোর সঙ্গে কোনো কথা না বলেই চোরের মতো অফিস ত্যাগ করেন তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু।
অতীত ইতিহাস ও রাজনৈতিক পরিচয়ের জালিয়াতি
মিন্টুর এই অপকর্মের ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৯৭ সালে তার বড় ভাই ফকির শওকত পরিচালিত যশোরের ‘দৈনিক লোকসমাজ’ পত্রিকায় শিক্ষানবিশ হিসেবে তার সাংবাদিকতা শুরু। রিপোর্টিংয়ে অদক্ষতার কারণে তাকে মফস্বল বিভাগে পাঠানো হয়। সেখানে প্রতিনিধিদের কাছ থেকে অর্থ লেনদেনের অভিযোগে ২০০০ সালে তাকে প্রথম চাকরিচ্যুত করা হয়।
পরে ২০০১ সালে ঢাকায় এসে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর ২০১৩ সালে প্রাইম গ্রুপের ‘দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম’-এর সম্পাদক হন। সেখানে ভাই, স্ত্রী ও আত্মীয়দের ভুয়া কর্মকর্তা সাজিয়ে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন। ক্রমাগত লোকসান ও চরম আর্থিক অনিয়ম টের পেয়ে দুই বছরের মাথায় মালিকপক্ষ পোর্টালটি বন্ধ করে দেয়। সে সময় তার বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মধ্যস্থতায় তা থেমে যায়।
বর্তমানে নিজেকে যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের ছাত্রদল নেতা হিসেবে দাবি করলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনি কখনো ছাত্রদল করেননি; বরং বামপন্থী দল ‘ছাত্রমৈত্রী’র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার পরিবারও নড়াইলের মূল বাসিন্দা হলেও রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলে যশোরের পরিচয় ব্যবহার করে আসছিল। প্রতারণা, অসততা ও নৈতিক অবক্ষয়ের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মিন্টুর এই সাম্রাজ্যের পতনকে গণমাধ্যমকর্মীরা স্বস্তির চোখে দেখছেন।