ঢাকা, রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৩:৪৩:১০ PM

নীতি বদলাচ্ছে পেন্টাগন:চীন-রাশিয়া বনাম যুক্তরাষ্ট্র

ডেস্ক রিপোটার।। করাপশনমিরর.কম
06-08-2026 02:20:35 PM
নীতি বদলাচ্ছে পেন্টাগন:চীন-রাশিয়া বনাম যুক্তরাষ্ট্র

চীন-রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের বিষয়টি বিবেচনা করে নতুন পারমাণবিক অস্ত্র কৌশল (নিক্লিয়ার ডক্ট্রিন) প্রণয়ন করছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের এই পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পেন্টাগনের নীতিবিষয়ক প্রধান এলব্রিজ কোলবির তত্ত্বাবধানে তৈরি হওয়া এই কৌশলে দীর্ঘপাল্লার কৌশলগত (স্ট্র্যাটেজিক) ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবর্তে আঞ্চলিক যুদ্ধে স্বল্পপাল্লার কৌশলগত (ট্যাকটিক্যাল) পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বুধবার (৫ আগস্ট) একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এ সংবাদ প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ। প্রতিবেদনের তথ্য মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে তদারকির দায়িত্বে থাকা (ইউএস স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড)-এর একটি ব্যক্তিগত সামরিক অনুষ্ঠানে এই পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করার কথা রয়েছে। নেব্রাস্কায় আয়োজিত এই বৈঠকে আলোচনার নেতৃত্ব দেবেন এলব্রিজ কোলবি।

পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, রাশিয়া বা চীনের সঙ্গে কোনো আঞ্চলিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো হামলার শিকার হলে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে, সেই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যই এই কৌশল তৈরি করা হচ্ছে।মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এনবিসিকে বলেন, ‘আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, আমাদের বিশ্বাসযোগ্য পারমাণবিক বিকল্প থাকা প্রয়োজন।’

তার মতে, এই কৌশল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা সীমিত করবে না বরং বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য পারমাণবিক বিকল্প বাড়িয়ে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আরও বিস্তৃত করবে এবং একই সঙ্গে প্রতিরোধ ক্ষমতা (ডিটারেন্স) শক্তিশালী করবে।

এলব্রিজ কোলবি দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। এসব অস্ত্র তুলনামূলকভাবে ছোট আকারের, স্বল্পপাল্লার এবং যুদ্ধক্ষেত্র বা নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ব্যবহারের জন্য তৈরি। তবে, এসব স্বল্পপাল্লার পারণাবিক অস্ত্র পুরো শহর ধ্বংসের উদ্দেশ্যে নয়।তিনি আরও যুক্তি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পারমাণবিক নীতিতে (নিউক্লিয়ার ডক্ট্রিন) যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। কারণ এই ডক্ট্রিন মূলত এমন দীর্ঘপাল্লার স্ট্র্যাটেজিক অস্ত্র ব্যবহারের জন্য গৃহীত যা প্রতিপক্ষের পুরো পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে পারে।

প্রতিরক্ষা বিভাগের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘যদি আপনি সম্প্রসারিত প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সত্যিকার অর্থে বিশ্বাসযোগ্য করতে চান তাহলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এমন পারমাণবিক সক্ষমতা দিতে হবে, যা প্রয়োজনে বাস্তবিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব বলে মনে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘অন্যথায় নেতৃত্বের সামনে কেবল চরমপন্থি বিকল্পই থাকবে, যা প্রতিপক্ষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে না। এতে প্রতিরোধ ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়বে।’মার্কিনি নীতি ও নতুন বিতর্ক:

এই প্রস্তাবিত পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক নীতি নিয়ে আবারও স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী পুরোনো বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। মূল প্রশ্ন হলো-কীভাবে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি না বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে পরমাণু ইস্যুতে নিরুৎসাহিত করবে।

সমালোচকদের মতে, কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর বেশি গুরুত্ব দিলে প্রচলিত যুদ্ধেও এসব অস্ত্র ব্যবহারের মানসিক বাধা কমে যেতে পারে। এর ফলে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি বেড়ে যাবে।প্রস্তাবটি সম্পর্কে অবগত কংগ্রেসের এক জ্যেষ্ঠ সহকারী এনবিসিকে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট স্পষ্টভাবেই আরও বেশি বিকল্প ও সক্ষমতা চান, কম নয়। এই গবেষণা সেই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে।’

মার্কিন পরমাণু নীতি :
যুক্তরাষ্ট্রের নিউক্লিয়ার ডকট্রিন বা পারমাণবিক নীতি মূলত হিসাব কষে তৈরি করা অস্পষ্টতা (Calculated Ambiguity) কৌশলের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। মার্কিন প্রশাসন কখনোই এমন কোনো চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি দেয়নি যে তারা প্রথমে পারমাণবিক হামলা চালাবে না (No First Use)। এর অর্থ হলো, পরিস্থিতি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র শত্রুর বিরুদ্ধে যেকোনো সময় প্রথমেই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার (First Use) করার অধিকার নিজের হাতে রেখেছে। দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট-এর তথ্য মতে এক্ষেত্রে যেসব বিষয় বিবেচনা করা হয়,

ক) যদি কোনো শত্রু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের সাধারণ সামরিক বা প্রচলিত (Conventional) হামলা চালায়, তবে এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।খ) জৈবিক বা রাসায়নিক অস্ত্রের (WMD) হামলার বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র তার পারমাণবিক শক্তি প্রয়োগের বিকল্প খোলা রেখেছে।

গ) মার্কিন নীতি অনুযায়ী, পারমাণবিক হামলার ক্ষেত্রে সরাসরি বেসামরিক জনগণকে লক্ষ্যবস্তু করা হয় না বরং শত্রুর সামরিক ঘাঁটি, মিসাইল সাইট ও কমান্ড সেন্টারকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করা হয়।

উল্লেখ্য, ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমায় এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকি শহরে ‘লিটলবয় ও ফ্যাটম্যান’ পারমানবিক বোমা নিক্ষেপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই ঘটনার ৮১ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের এমন নীতিতে আবারও পরমাণু যুদ্ধের শঙ্কা বাড়ছে।