ঢাকা, রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ১০:০৬:১৭ PM

বেতন ১০ হাজার,৪ কোটির প্রাসাদ কর্মচারীর!

স্টাফ রিপোটার।। করাপশনমিরর.কম
09-08-2026 02:27:53 PM
বেতন ১০ হাজার,৪ কোটির প্রাসাদ কর্মচারীর!

সরকারি চাকরির ১৪তম গ্রেডে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের ক্যাশিয়ার মো. জাহাঙ্গীর আলম। চাকরির প্রায় ২০ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর দৃশ্যমান সম্পদের পরিমাণ নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন একই পদে দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রভাবশালী একটি ‘কমিশন সিন্ডিকেট’ গড়ে তুলেছেন। ঠিকাদারদের অভিযোগ, বিল পাসসহ গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমে কমিশন ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

স্থানীয়দের দাবি, জাহাঙ্গীর আলমের গ্রামের বাড়িতে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি দৃষ্টিনন্দন ভবন রয়েছে। পাশাপাশি ফরিদপুর শহরে ১০ তলা একটি ভবনে তাঁর একটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া তাঁর নিজের ও স্ত্রীর নামে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি। এসব সম্পদের সঙ্গে তাঁর সরকারি চাকরি থেকে পাওয়া আয় কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে।

বিল পাসে ৫ শতাংশ কমিশনের অভিযোগ

একাধিক স্থানীয় ঠিকাদারের অভিযোগ, গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন কাজের বিল পাস করতে ক্যাশিয়ার জাহাঙ্গীর আলমকে ৫ শতাংশ কমিশন দিতে হয়। শুধু বিল পাস নয়, প্রাক্কলন (এস্টিমেট) তৈরি, ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়ন ও নতুন লাইসেন্স ইস্যুসহ বিভিন্ন কাজেও অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় বলে অভিযোগ তাঁদের।

ঠিকাদারদের দাবি, কেউ নির্ধারিত কমিশন বা অতিরিক্ত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁর ফাইল আটকে রাখা হয়। এতে ঠিকাদারদের নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার বলেন, দীর্ঘদিন একই দায়িত্বে থাকার কারণে জাহাঙ্গীর আলমের একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, ওই প্রভাববলয়ের মাধ্যমে গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়।

আয়ের সঙ্গে সম্পদের ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন

জানা গেছে, ১৪তম গ্রেডের সরকারি চাকরিতে জাহাঙ্গীর আলমের মূল বেতন ছিল ১০ হাজার ২০০ টাকা। তাঁর চাকরিজীবনের শুরুতে এই বেতন ধরে ২০ বছরে মূল বেতন বাবদ প্রায় ২৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা হয়। অবশ্য সময়ের সঙ্গে বেতন বৃদ্ধি, বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য বৈধ আয়ের বিষয়ও রয়েছে।

তবে স্থানীয়ভাবে দৃশ্যমান তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ বিবেচনায় নিলে আয়ের সঙ্গে সম্পদের একটি বড় ব্যবধান রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে গ্রামের বাড়ির বহুতল ভবন, শহরের ফ্ল্যাট এবং জমিজমার মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

তাঁর এসব সম্পদের প্রকৃত মূল্য, মালিকানা ও অর্থের উৎস সম্পর্কে সরকারি নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্পদের অর্থের উৎস সম্পর্কে জাহাঙ্গীরের বক্তব্য

নিজের সম্পদের অর্থের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর আলম জানান, গ্রামের বাড়ি নির্মাণের সময় তিনি ব্যাংক থেকে ৬০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। এছাড়া আপন বড় বোনের কাছ থেকে চেকের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা নিয়েছেন বলে দাবি করেন। তাঁর স্ত্রীর নামে সোনালী ব্যাংক থেকে ৮ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি নিজের প্রায় ১০ লাখ টাকার সঞ্চয় ভেঙে বাড়ি নির্মাণে ব্যয় করেছেন বলে দাবি করেন।

তবে এসব ঋণ ও অর্থের উৎসের সমর্থনে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা সংশ্লিষ্ট নথিপত্র দেখাতে পারেননি তিনি।

ঠিকাদারদের কমিশন দেওয়ার অভিযোগ এবং ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর আলম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, তিনি কোনো ধরনের সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত নন।

চেয়ারম্যানের বক্তব্য

স্থানীয় কামারখালী (১ নম্বর) ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চৌধুরী ইরান হোসেন জানান, জাহাঙ্গীর আলমের বাবা একজন ভূমি কর্মকর্তা ছিলেন। তবে তাঁর বাবার রেখে যাওয়া সম্পদের পরিমাণ এত বেশি ছিল না যে, তা দিয়ে জাহাঙ্গীর আলম বর্তমানে এলাকায় যে ধরনের সম্পদ গড়ে তুলেছেন, তার পুরোটা করা সম্ভব।

তবে এসব সম্পত্তি জাহাঙ্গীর আলমের নিজের নামে নাকি পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে—এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারেননি চেয়ারম্যান।

নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রতিক্রিয়া

অভিযোগের বিষয়ে ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খায়রুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তাঁর জানামতে ঠিকাদারদের পক্ষ থেকে ক্যাশিয়ার জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে করা অভিযোগগুলো সঠিক নয়।

তবে জাহাঙ্গীর আলমের ব্যক্তিগত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ এবং এসব সম্পদের অর্থের উৎস সম্পর্কে তিনি কোনো তথ্য জানেন না বলে জানান।

সব মিলিয়ে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ওঠা কমিশন বাণিজ্য ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তাঁর আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, ঋণের কাগজপত্র এবং জমি-ফ্ল্যাটের মালিকানাসংক্রান্ত দলিল পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত হলে তাঁর দৃশ্যমান সম্পদের প্রকৃত উৎস এবং এসব সম্পদ তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা স্পষ্ট হতে পারে।