গত বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, রাঙামাটির ভেদভেদী এলাকার বাইতুস সালাম জামে মসজিদের নিকটবর্তী বাসায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে গুরুতর মারধর ও অপহরণের শিকার হন ঢাকার উত্তরা পূর্ব থানা এলাকার ইলেকট্রনিকস পণ্যের পাইকারি ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম। ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, চাঁদার টাকা না দেওয়ায় উত্তরা পূর্ব থানা হেফাজতে ইসলামের সদস্য ইলিয়াস আহমেদ ও সংগঠনের অন্য কর্মীরা এই হামলা ও অপহরণ ঘটান। শহিদুল ইসলামেরবড় ভাই, হাশেম আলী আরও দাবি করেন, হেফাজতে ইসলামের ঢাকা মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মামুনুল হকের নির্দেশে তাঁকে তুলে নেওয়া হয়।
হাশেম আলীর ভাষ্যমতে, তার ভাই ২০২৬ সালের মার্চ মাসে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান “মেসার্স ইসলাম ট্রেডার্স” প্রতিষ্ঠাকরেন। ব্যবসা শুরু করার কিছুদিনের মধ্যে ইলিয়াস আহমেদ একদল হেফাজত কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আসেন এবং মাওলানা মামুনুল হকের নামে মাসিক চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে মারধর করা হয়। এ বিষয়ে অভিযোগ জানাতে উত্তরা পূর্ব থানায় গেলে পুলিশ তাঁকে ফিরিয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে ক্রমাগত হুমকির কারণে শহিদুল ইসলাম ঢাকা ছেড়ে রাঙামাটিতে আত্মগোপন করেন, যেখান থেকে তাঁকে অপহরণ করা হয়।
এ ছাড়া, শহিদুল ইসলামের অপহরণের ঘটনায় মামলা করতে রাঙামাটি কোতোয়ালী থানায় গেলে তাঁর ভাই হাশেম আলী পুলিশ কর্মকর্তার হাতে মারধর ও হুমকির শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে।
“আমার ভাই কোথায়, বেঁচে আছে কি না, তা আমরা কেউ জানি না,” বলেন হাশেম আলী। “থানায় যাওয়ার পর কর্মকর্তারা ইলিয়াস আহমেদ ও হেফাজতের নাম শুনেই আমাকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। প্রতিবাদ করলে আমাকে ধরে মারতে শুরু করেন। এটা কেমন বিচারব্যবস্থা?”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাঙামাটি কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।
মাওলানা মামুনুল হক এবং ইলিয়াস আহমেদের বিরুদ্ধে এধরণের আরো অনেক অভিযোগ উঠেছে।
ঢাকার আব্দুল্লাহপুরের রিপন এগ্রো ট্রেডার্সের মালিক মোঃ বদিউজ্জামান অভিযোগ করেন, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে তিনি ইলিয়াস আহমেদ ও হেফাজতে ইসলামকে মাসিক চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
তিনি বলেন, “ডিসেম্বর২০২৫এআমার ছেলে অসুস্থ হয়। হাসপাতালে তার চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে ইলিয়াসকে চাঁদার টাকা দিতে পারিনি। তখন সে দলবল সহছুরি ও চাপাতি নিয়ে হাতে আমার বাসায় আসে। টাকা না দিলে আমাকে জবাই করার হুমকি দেয়। শেষ পর্যন্ত আমার স্ত্রী তাঁর বিয়ের গয়না দিতে বাধ্য হন।”
অন্যদিকে, ঢাকার গুলশান এলাকার নিবারণ জুয়েলার্সের মালিক নিবারণ চন্দ্র দাসের স্ত্রী রানী দাস অভিযোগ করেন, রাজশাহী সদরের সাহেববাজার এলাকা থেকে তাঁর স্বামীকে অপহরণ করেন ইলিয়াস আহমেদ ও হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা।
রানী দাস জানান, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে তাঁর স্বামীর কাছে ১৫ লাখ টাকা দাবি করেন ইলিয়াস আহমেদ। ওই টাকা দিতে না পেরে নিবারণ চন্দ্র দাস ব্যবসা বন্ধ করে রাজশাহীতে আত্মগোপন করেন। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের পর ০৮/০৩/২০২৬ সেখানে গিয়ে ইলিয়াস আহমেদ ও তাঁর সহযোগীরা নিবারণকে অপহরণ করেন। রানী দাস আরো জানান যে এখন পর্যন্ত তার স্বামী নিখোঁজ এবং কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার গিয়েও কোনো ন্যায়বিচার পাননি।
আরো জানা গেছে যেইলিয়াস আহমেদ পূর্বেনিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের উত্তরা পূর্বথানা শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।এ ছাড়া, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তিনি দুই দফায় কারাগারে ছিলেন বলে জানা গেছে।
নির্মাণ ব্যবসায়ী আবুল কাদের বলেন, “উত্তরায় ইলিয়াস আহমেদ একজন পরিচিত সন্ত্রাসী। আগে সে ছাত্রলীগের নেতা ছিল। উত্তরা পূর্ব থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি কুতুব উদ্দিনের নাম ব্যবহার করে আমার এবং অন্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা নিত। সরকার পরিবর্তনের পর দলের ব্যানার বদলায়, কিন্তু সন্ত্রাসী একই থাকে।”
হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সংগঠনটির ঢাকা মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মামুনুল হক বলেন, “হেফাজতে ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছে। এখন আমরাই চাঁদাবাজি করছি, এ ধরনের অভিযোগ সত্যিই হাস্যকর।”
ইলিয়াস আহমেদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ ও তাঁর ছাত্রলীগের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরে তিনি কীভাবে এবং কেন হেফাজতে ইসলামের সদস্য হয়েছেন, জানতে চাইলে মামুনুল হক বলেন, “এটা সত্য যে ইলিয়াস আহমেদ উত্তরা পূর্ব থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তবে আওয়ামী লীগের সব কর্মী এক নন। ইলিয়াস ইসলামী আদর্শ মেনে চলেন এবং একটি ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবারের সন্তান। আমি তাঁর মন জানি। তিনি আল্লাহর সৈনিক। তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
এ বিষয়ে ইলিয়াস আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।