ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে (ডিএসসিসি) নগর পরিকল্পনা বিভাগের শীর্ষ পদ ঘিরে নতুন করে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এর আগে জাল শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সনদ ব্যবহার করে স্থপতি পদে চাকরিতে প্রবেশ এবং দীর্ঘ ২২ বছর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের অভিযোগে মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম আলোচনায় আসেন। সম্প্রতি তাকে ওই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে শূন্য পদে যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা নিয়োগের পরিবর্তে নতুন করে দায়িত্ব পাওয়া মো. নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধেও জাল অভিজ্ঞতার সনদ দিয়ে চাকরিতে প্রবেশের অভিযোগ উঠেছে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর মো. নজরুল ইসলামকে ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তিনি নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে তাঁর মূল পদেও বহাল রয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, নগর পরিকল্পনাবিদ পদে নিয়োগের সময় প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা না থাকলেও সাভার পৌরসভার নামে একটি ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ দাখিল করে তিনি ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে চাকরিতে প্রবেশ করেন। পরবর্তী সময়ে সেই পদে বহাল থেকে এখন প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের চলতি দায়িত্বও পেয়েছেন।
অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নিয়োগবিধি অনুযায়ী, নগর পরিকল্পনাবিদ পদে নিয়োগের জন্য স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পাশাপাশি সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে সহকারী নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ হিসেবে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। সংশ্লিষ্ট পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেও এসব শর্ত উল্লেখ ছিল বলে জানা গেছে।
কিন্তু নজরুল ইসলাম চাকরির আবেদনের সঙ্গে সাভার পৌরসভায় নগর পরিকল্পনায় কাজ করার অভিজ্ঞতার সনদ জমা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই সময়ে সাভার পৌরসভায় ‘সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ’ বা ‘সহকারী অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ’ নামে কোনো পদ ছিল না। এমনকি নজরুল ইসলাম সেখানে অন্য কোনো পদেও চাকরি করেননি বলে দাবি করা হয়েছে। সাভার পৌরসভার নথিপত্রেও তাঁর চাকরিসংক্রান্ত গ্রহণযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীদের বক্তব্য।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর অভিজ্ঞতার সনদের সত্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সনদটি জাল হওয়ায় তাঁর নিয়োগের বৈধতা যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনৈতিকভাবে প্রভাবিত করে তিনি প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের দায়িত্ব পেয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও বক্তব্য ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে নিয়োগের সময়ই নজরুল ইসলামের অভিজ্ঞতার সনদ নিয়ে আপত্তি উঠেছিল। এ বিষয়ে অভিযোগও জমা পড়েছিল। ফলে তাঁর নিয়োগপত্র দীর্ঘদিন ঝুলে ছিল এবং তিনি সহজে চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছাত্রলীগের পরিচয় ব্যবহার এবং অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে তিনি চাকরিতে যোগদানের সুযোগ পান বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
অন্যদিকে, প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের পদে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের ঘটনাও ডিএসসিসির প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ২০০৪ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের আকস্মিক মৃত্যুর পর পদটি শূন্য হয়। তখন স্থপতি পদে কর্মরত মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি পরবর্তী ২২ বছর এ দায়িত্বে বহাল ছিলেন।
সিরাজুল ইসলামের মূল পদে নিয়োগ নিয়েও জাল শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার সনদ ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থ আত্মসাৎ, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে। গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ, দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দাখিল এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তদন্তের পর সম্প্রতি তাঁকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে সিরাজুল ইসলাম বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের ক্ষতি করেছেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে কী প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য প্রয়োজন।
অভিজ্ঞ মহলের মতে, নগর পরিকল্পনা বিভাগ একটি সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন, ভূমি ব্যবহার, অবকাঠামো নির্মাণ এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিভাগের শীর্ষ পদে যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তার পরিবর্তে বিতর্কিত নিয়োগ অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদে নগর উন্নয়ন কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে নাগরিক সেবা ও পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার ওপরও।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের পদে নিয়োগ ও দায়িত্ব প্রদানের পুরো প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। নজরুল ইসলামের অভিজ্ঞতার সনদ, নিয়োগের সময় জমা দেওয়া নথিপত্র এবং তাঁর যোগ্যতা যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে সিরাজুল ইসলামের দীর্ঘদিনের দায়িত্ব পালন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।