ঢাকা, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৫:০৫:৪০ AM

গণমাধ্যমে নারী কর্মীদের প্রতি আচরণ নিয়ে প্রশ্ন

স্টাফ রিপোটার।। করাপশন মিরর.কম
11-09-2026 10:27:00 AM
গণমাধ্যমে নারী কর্মীদের প্রতি আচরণ নিয়ে প্রশ্ন

দেশের কয়েকটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আচরণ, যৌন হয়রানির অভিযোগ এবং এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগগুলোর কোনোটি তদন্তাধীন, কোনোটি নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তবে সব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও বেশিরভাগ ঘটনায় আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাম্প্রতিক আলোচনায় এসেছে দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং তাদের অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলানিউজ২৪.কম। প্রতিষ্ঠানটির সম্পাদকের পদে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তনকে ঘিরে সাংবাদিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

গত ২৯ জুলাই বাংলানিউজ২৪.কম-এর সম্পাদক হিসেবে এ কে এম মঞ্জুরুল হককে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে তিনি দৈনিক দেশ রূপান্তরে কর্মরত ছিলেন। সেখানে ‘স্মৃতি’ নামের এক নারী সহকর্মী তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির লিখিত অভিযোগ করেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দেশ রূপান্তরে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছিল বলেও জানা গেছে।

তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল পত্রিকাটির লাইফস্টাইল এডিটর ও ফিচার ইনচার্জ মোহসীনা লাইজুকে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তদন্তে মঞ্জুরুল হকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। তবে তদন্ত-পরবর্তী কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই তিনি দেশ রূপান্তর ছেড়ে বাংলানিউজ২৪.কম-এ সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।

এ কারণে গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—একটি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির অভিযোগের তদন্ত চলমান থাকা এবং তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার দাবি থাকার পরও কীভাবে একজন ব্যক্তি অন্য একটি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সম্পাদকীয় নেতৃত্বে আসেন। তবে তদন্ত প্রতিবেদনটির পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু এবং অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের সব দিক স্বাধীনভাবে যাচাই না করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সম্ভব নয়।

এদিকে এর আগে বাংলানিউজ২৪.কম-এর সম্পাদক পদে থাকা তোহিদুল ইসলাম মিন্টুকে নারীকে ধর্ষন করতে চাওয়া আবদারসহ নারী-সংক্রান্ত একাদিক অভিযোগের পর দায়িত্ব হারাতে হয়েছে বলেও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। এ ঘটনায় একজন নারী সাংবাদিক থানায় অভিযোগ করেছেন বলে দাবি করা হলেও অভিযোগের বর্তমান অগ্রগতি এবং আইনগত অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে নেই।

এর বাইরে ঢাকার আরেকটি বড় বেসরকারি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নারী প্রতিবেদকের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অশোভন আচরণের অভিযোগ নিয়েও সাংবাদিক মহলে আলোচনা চলছে। একাধিক অনানুষ্ঠানিক সূত্রের দাবি, ওই কর্মকর্তা ফোনে নারী সহকর্মীর সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা তৈরির চেষ্টা করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই নারী সাংবাদিক এতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলেও কথোপকথন চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাকে অনুরোধ করা হয়।

ঘটনাটির কথোপকথনের কিছু নথি সংশ্লিষ্টদের হাতে রয়েছে বলে দাবি করা হলেও সেগুলোর সত্যতা ও পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাংবাদিক মহলের কয়েকজনের ভাষ্য, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন, প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ কিংবা অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গণমাধ্যমে কর্মরত নারী সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ ও পেশাদার কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম দায়িত্ব। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের অভিযোগ উঠলে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয়ের বক্তব্য গ্রহণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

বিশেষ করে গণমাধ্যমের মতো প্রতিষ্ঠান, যেখানে নৈতিকতা ও জবাবদিহি পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, সেখানে অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ সত্য হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মিথ্যা বা অসমর্থিত অভিযোগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ন্যায্যতার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই শুধু কয়েকজন ব্যক্তিকে ঘিরে বিতর্ক নয়; বরং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্বে নিয়োগ, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে এনেছে।