ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০১:১২:০০ PM

নমঃশূদ্র সমাজের ইতিহাস, সামাজিক বৈষম্য

ফেসবুক থেকে নেয়া
25-09-2026 06:13:47 AM
নমঃশূদ্র সমাজের ইতিহাস, সামাজিক বৈষম্য

ভূমিকা
বাংলার ইতিহাস শুধু রাজা-রাজড়া, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ইতিহাস নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত রয়েছে কৃষক, মৎস্যজীবী, শ্রমজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক জীবন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। বাংলার অন্যতম বৃহৎ হিন্দু জনগোষ্ঠী নমঃশূদ্রদের ইতিহাস সেই বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাদের পরিচয়, সামাজিক অবস্থান, জাতিভিত্তিক বৈষম্যের অভিজ্ঞতা এবং উনিশ ও বিশ শতকে আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বাংলার সামাজিক ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

প্রাচীন উৎস ও পরিচয়
নমঃশূদ্রদের উৎপত্তি সম্পর্কে একক ও সর্বসম্মত ঐতিহাসিক মত নেই। ঔপনিবেশিক যুগের নৃতাত্ত্বিক বিবরণ ও পরবর্তী গবেষণায় তাদের পূর্বপুরুষদের বাংলার পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের জলাভূমি ও নদীবিধৌত অঞ্চলের কৃষি, মৎস্যশিকার ও নৌজীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখা হয়েছে। ফরিদপুর, বরিশাল, ঢাকা, যশোর, খুলনা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে তাদের ঘনবসতি ছিল। উনিশ শতকের শেষভাগে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে পৃথক সামাজিক পরিচয় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ক্রমশ শক্তিশালী হয়। 


তাদের সরাসরি ‘অস্ট্রিক’ বা ‘দ্রাবিড়’ জাতির একক উত্তরসূরি হিসেবে চিহ্নিত করা বর্তমান গবেষণায় নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নয়। বরং বাংলার দীর্ঘ সামাজিক ও জনবৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে তাদের ইতিহাসকে দেখা অধিকতর গ্রহণযোগ্য।

সেন যুগ, বর্ণব্যবস্থা ও ‘চণ্ডাল’ পরিচয়
সেন যুগে বাংলায় ব্রাহ্মণ্যধর্মীয় সামাজিক কাঠামোর প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং কৌলিন্য প্রথার বিকাশ ঘটে। পরবর্তী সামাজিক স্মৃতি ও কিছু গবেষণায় বল্লাল সেনের সঙ্গে নিম্নবর্ণের মানুষের সামাজিক অবনমনের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। তবে ‘বল্লাল সেনই নমঃশূদ্রদের চণ্ডাল হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন’—এমন সরল ও প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পক্ষে সুস্পষ্ট সমসাময়িক প্রমাণ নেই। সেন যুগে সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস শক্তিশালী হওয়ার প্রক্রিয়াকে বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন।

বাংলার মধ্যযুগীয় কিছু ধর্মীয় ও পুরাণভিত্তিক গ্রন্থে ‘চণ্ডাল’কে নিম্ন বা অন্ত্যজ সামাজিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বৃহদ্ধর্ম পুরাণ-এ চণ্ডালসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছে। এসব গ্রন্থ তৎকালীন সমাজের আদর্শায়িত বর্ণচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলেও এগুলোকে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বাস্তব জাতিগত উৎপত্তির নির্ভুল ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। 


পাল ও সেন যুগের ধর্মীয় পরিবর্তন
পাল আমলে বাংলায় বৌদ্ধধর্মের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল। সেন যুগে ব্রাহ্মণ্যধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক বিধিব্যবস্থার প্রভাব বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী কিছু নমঃশূদ্র ঐতিহ্যে এই পরিবর্তনকে তাদের পূর্বপুরুষদের সামাজিক অবনতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তবে ‘পাল আমলে নমঃশূদ্রদের পূর্বপুরুষরা ব্যাপকভাবে বৌদ্ধ ছিলেন এবং সেন রাজারা তাঁদের পরিকল্পিতভাবে চণ্ডালে পরিণত করেন’—এই ধারাবাহিকতাকে ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রত্যক্ষ প্রমাণ সীমিত এবং গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

১৮৭২–৭৩ সালের সামাজিক বয়কট আন্দোলন
নমঃশূদ্র আত্মমর্যাদা আন্দোলনের ইতিহাসে ১৮৭২–৭৩ সালের ফরিদপুর-বাখরগঞ্জ অঞ্চলের সামাজিক বয়কট আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একটি শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে উচ্চবর্ণের মানুষের অংশগ্রহণ প্রত্যাখ্যানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নমঃশূদ্ররা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিবাদ সংগঠিত করে। তারা উচ্চবর্ণের মানুষের বাড়িতে বিভিন্ন শ্রম দেওয়া, কৃষিকাজ করা এবং অন্যান্য সহযোগিতা থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। আন্দোলনটি দীর্ঘস্থায়ী না হলেও এটি নমঃশূদ্র সমাজে সংগঠন, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক সংহতির নতুন চেতনা সৃষ্টি করে। 


হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুর এবং মতুয়া আন্দোলন
উনিশ শতকে শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে মতুয়া ধর্মীয়-সামাজিক আন্দোলনের বিকাশ নমঃশূদ্র সমাজের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করে। সহজ ভক্তি, মানবিক মর্যাদা, শ্রম ও সামাজিক সমতার ওপর এই আন্দোলনে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

পরবর্তীকালে গুরুচাঁদ ঠাকুর শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নকে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কর্মসূচিতে পরিণত করেন। নমঃশূদ্র সমাজের শিক্ষাবিস্তার, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়। মতুয়া আন্দোলন ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি একটি সামাজিক সংহতির ক্ষেত্রও তৈরি করে। 


‘চণ্ডাল’ থেকে ‘নমঃশূদ্র’
ঔপনিবেশিক শাসনামলে জনগণনা ও প্রশাসনিক শ্রেণিবিন্যাস জাতিগত পরিচয়কে নতুন রাজনৈতিক গুরুত্ব দেয়। উনিশ শতকের জনগণনা প্রতিবেদনে ‘চণ্ডাল’ নামটি ব্যবহৃত হলেও পরবর্তী সময়ে সম্প্রদায়ের নেতারা ‘নমঃশূদ্র’ নাম গ্রহণ ও স্বীকৃতির জন্য আন্দোলন করেন। ১৯১১ সালের জনগণনা থেকে ‘নমঃশূদ্র’ নামটি সরকারি নথিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই পরিবর্তন ছিল কেবল নামের পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল সামাজিক অপমানের বিরুদ্ধে আত্মপরিচয় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবি। 


রাজনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রা
বিশ শতকের প্রথমার্ধে নমঃশূদ্র সমাজ শিক্ষা, কৃষি, সংগঠন ও রাজনীতিতে ক্রমশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক ভারতের সাংবিধানিক সংস্কারের ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ধারার অন্যতম উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। তিনি পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ও প্রথম দিকের আইনমন্ত্রী ছিলেন; পাকিস্তানের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। 


উপসংহার
নমঃশূদ্রদের ইতিহাসকে শুধু একটি জাতির ‘উত্থান-পতনের’ ইতিহাস হিসেবে দেখলে তার পূর্ণ তাৎপর্য বোঝা যায় না। এটি বাংলার জাতিভিত্তিক সামাজিক কাঠামো, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, ধর্মীয় পরিবর্তন, ঔপনিবেশিক জনগণনা এবং আধুনিক রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ‘চণ্ডাল’ থেকে ‘নমঃশূদ্র’ পরিচয়ে উত্তরণ, ১৮৭২–৭৩ সালের সামাজিক প্রতিবাদ, মতুয়া আন্দোলনের বিকাশ এবং শিক্ষা ও রাজনৈতিক সংগঠনের বিস্তার—সব মিলিয়ে এই ইতিহাস আত্মমর্যাদা ও সামাজিক অধিকারের দীর্ঘ সংগ্রামের দলিল।

তবে এই ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে প্রচলিত সামাজিক স্মৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং আধুনিক ইতিহাসচর্চার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই নমঃশূদ্র ইতিহাসকে যথাযথ মর্যাদায় তুলে ধরতে হলে আবেগের পাশাপাশি প্রামাণ্য দলিল, জনগণনা, সমসাময়িক সাহিত্য এবং আধুনিক গবেষণাকেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।