ঢাকা, সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০১:৪৬:৩৯ PM

সংকটের দিন পেরিয়ে আস্থার প্রতীক রিজভী

স্টাফ রিপোটার।। করাপশনমিরর.কম
17-08-2026 06:49:06 AM
সংকটের দিন পেরিয়ে আস্থার প্রতীক রিজভী

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা নেতাদের মধ্যে রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক পথচলা নানা সংকট, ত্যাগ ও সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দলীয় বক্তব্য গণমাধ্যমে তুলে ধরার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে তাঁর পরিচয়ের একটি বড় অংশ গড়ে উঠেছে সংকটের সময় দলের পাশে থাকা এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিবেদিত রাখার মধ্য দিয়ে আজকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়েছেন তিনি।

রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নয়াপল্টনের বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তাঁর অবস্থান। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর রিজভী দলীয় কার্যালয়েই অবস্থান শুরু করেন। প্রায় ৭৮৭ দিন বা দুই বছর এক মাসের বেশি সময় তিনি সেখানে ছিলেন। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ খালেদা জিয়া মুক্তি পাওয়ার পরদিন, ২৬ মার্চ তিনি কার্যালয় ছেড়ে নিজ বাসায় ফিরে যান।

সেই সময় দলীয় কার্যালয় থেকেই রিজভী নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করতেন, গণমাধ্যমে দলের বক্তব্য ও প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠাতেন এবং নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়ার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত দলীয় কার্যালয়ে থাকার পাশাপাশি নেতা-কর্মীরা যেন রাজনৈতিক প্রয়োজনে কার্যালয়ে এসে কাউকে না পাওয়ার পরিস্থিতিতে না পড়েন—এমন একটি দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি সেখানে অবস্থান করেছিলেন।

বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সময় দলটির পক্ষে গণমাধ্যমে নিয়মিত বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে রিজভীর ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি, প্রতিক্রিয়া ও বিভিন্ন দাবি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে প্রায় নিয়মিত দেখা গেছে। নয়াপল্টনের কার্যালয় হয়ে উঠেছিল তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

রিজভীর এই রাজনৈতিক পথচলায় ব্যক্তিগত ত্যাগের ঘটনাও আলোচিত। আশির দশকের রাজনৈতিক আন্দোলনে মিছিলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার কারণে তাঁর শরীরে স্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়েছে—এমন তথ্য দীর্ঘদিন ধরে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে আলোচিত হয়ে আসছে। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁকে এখনো লাঠিতে ভর দিয়ে চলতে দেখা যায়। ফলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী সক্রিয়তা অনেকের কাছেই আলাদা তাৎপর্য বহন করে।

রাজনীতিতে প্রায়ই বলা হয়, সংকটের সময়ে অনেকেই সামনে থাকেন, কিন্তু সুসময় এলে সেই ত্যাগের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন। রিজভীর রাজনৈতিক ভূমিকা মূল্যায়ন করতে গিয়ে তাঁর সমর্থকেরা বরং ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন। তাঁদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সময়ে তিনি দলের কর্মসূচি ও সাংগঠনিক যোগাযোগ সচল রাখতে যে ভূমিকা রেখেছেন, তা কেবল পদ-পদবির বিচারে মূল্যায়ন করা যায় না।

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখেও তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে চেয়ারম্যান এবং রুহুল কবির রিজভীকে সদস্যসচিব করা হয়। এই কমিটির দায়িত্ব ছিল নির্বাচনী কর্মকাণ্ড সমন্বয় ও পরিচালনা করা।

এর আগে দলের বিভিন্ন সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, কমিটি গঠন ও গণমাধ্যমে দলীয় অবস্থান জানানোর ক্ষেত্রেও রিজভীর স্বাক্ষর ও বক্তব্য নিয়মিত সামনে এসেছে। 

রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে তাই শুধু একটি পদ নয়; বরং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা, দলীয় কার্যালয়কেন্দ্রিক কর্মতৎপরতা, নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংকটের সময় সামনে থাকার একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়নে সমর্থকেরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন ত্যাগ, আনুগত্য ও সাংগঠনিক নিষ্ঠাকে।

নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও সেই কারণেই কেবল একটি কর্মস্থলের সম্পর্ক নয়। সেখানে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম, সংবাদ সম্মেলন, আন্দোলনের কর্মসূচি, নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত জীবনের অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে। দুই বছরেরও বেশি সময় কার্যালয়ে অবস্থানের ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এমন এক অধ্যায়, যা বিএনপির সাম্প্রতিক ইতিহাসেও ব্যতিক্রমী হিসেবে আলোচিত।

সব মিলিয়ে রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক যাত্রা দেখায়—দলের কঠিন সময়ে একজন নেতার ভূমিকা কেবল বক্তৃতা বা পদ-পদবিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। কখনো কখনো দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠনের পাশে থাকা, নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করাই হয়ে ওঠে রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রিজভীর ক্ষেত্রে সেই পরিচয়ই তাঁকে বিএনপির রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে দিয়েছে।