ঢাকা, শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ১১:৩৩:০৯ PM

শত কোটি টাকার কারসাজি‘আফসার সিন্ডিকেটের

স্টাফ রিপোটার।। করাপশনমিরর.কম
08-08-2026 02:48:36 PM
শত কোটি টাকার কারসাজি‘আফসার সিন্ডিকেটের

বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকোমোটিভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ট্রাকশন মোটর। ট্রেনের চাকা ঘোরানো থেকে শুরু করে ভারী ট্রেন টানা—সব ক্ষেত্রেই এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ মেরামতের কাজ ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী ঠিকাদার চক্রের আধিপত্যের অভিযোগ উঠেছে। উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হলেও শর্ত পরিবর্তন, নির্ধারিত প্রাক্কলনের চেয়ে বেশি দামে কার্যাদেশ, নিজস্ব কারখানা না থাকা সত্ত্বেও কাজ পাওয়া এবং রেলের সরকারি কারখানা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ৮ মার্চ ট্রাকশন মোটর মেরামতের কাজ নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সর্বশেষ ৩৪টি ট্রাকশন মোটর মেরামতের প্রায় ৬ কোটি টাকার একটি দরপত্রেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

প্রাক্কলনের চেয়ে ৮ শতাংশ বেশি দামে কাজ

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ২৩০০, ২৪০০, ৬০০০ ও ৬১০০ সিরিজের লোকোমোটিভের ৩৪টি ট্রাকশন মোটর মেরামতের জন্য প্রায় ৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে প্রায় ৮ শতাংশ বেশি, অর্থাৎ ৬ কোটি ৪৫ লাখ ৫২ হাজার ৬০৪ টাকায় কার্যাদেশ পায় ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স সৃজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ’।

দরপত্রের মূল্য প্রাক্কলনের চেয়ে বেশি হলেও মূল্যায়ন উপকমিটি ও কারিগরি কমিটি দরটি ‘বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’ উল্লেখ করে অনুমোদনের সুপারিশ করে।

নথি অনুযায়ী, দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল ১৭ ডিসেম্বর। পরে সৃজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সময় বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর করা হয়। একই আবেদনের পর অভিজ্ঞতার শর্তেও পরিবর্তন আনা হয়। শুরুতে অন্তত ৩০ লাখ টাকার সমজাতীয় কাজের অভিজ্ঞতা চাওয়া হলেও পরে তা বাড়িয়ে ৩ কোটি টাকা করা হয়।

রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতার মূল্যসীমা নির্ধারণের ক্ষমতা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, অভিজ্ঞতা, বার্ষিক টার্নওভার ও আর্থিক সক্ষমতার শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়, যাতে নতুন বা মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ে।

নেপথ্যে একই ঠিকাদার?

রেলের একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের অভিযোগ, ট্রাকশন মোটর মেরামতের কাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন ঠিকাদার আফসার আলী বিশ্বাস। তাঁদের দাবি, প্রায় ১৭ থেকে ১৮ বছর ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি এ খাতের বড় অংশের কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বর্তমানে ‘মেসার্স সৃজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ’ ও ‘মেসার্স রোপিতা এন্টারপ্রাইজ’-এর মাধ্যমে ট্রাকশন মোটর মেরামতের কাজ নেওয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠান দুটির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন এলেও এগুলো শেষ পর্যন্ত আফসার আলী বিশ্বাসের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

আরও অভিযোগ রয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পরও তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ট্রাকশন মোটর ও আর্মেচার মেরামতের অন্তত ২১টি কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

নিজস্ব কারখানা না থাকার অভিযোগ

দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী ট্রাকশন মোটর মেরামতের কাজ পেতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মেরামত কারখানা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকার কথা। প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, আফসার আলী বিশ্বাসের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব পূর্ণাঙ্গ কারখানা নেই। তারা রেলের সরকারি কারখানা ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে মেরামতের কাজ সম্পন্ন করে থাকে।

এতে সরকারি সম্পদ ব্যবহারের বিনিময়ে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয় কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা। তাঁদের দাবি, তাঁরা নিজস্ব কারখানা, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল তৈরিতে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও কাজ পাচ্ছেন না।

নিম্নমানের মেরামতের অভিযোগ

ট্রাকশন মোটর মেরামতের মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, মেরামতের কয়েক মাসের মধ্যেই কোনো কোনো মোটর আবার বিকল হয়ে পড়ছে। ফলে একই মোটর পুনরায় মেরামতের প্রয়োজন হচ্ছে।

রেলসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকাগামী যাত্রীবাহী ট্রেনের ট্রাকশন মোটর মাঝপথে বিকল হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঢাকায় পৌঁছানোর পর ফিরতি যাত্রার আগেই মোটর অচল হয়ে পড়েছে। তখন বিকল্প ইঞ্জিন বা মোটর সংযুক্ত করে ট্রেন চালাতে হয়েছে।

দুদকের তদন্ত

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৮ মার্চ ট্রাকশন মোটর মেরামতসংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে নামে দুদক। সংস্থাটির উপপরিচালক (মানিলন্ডারিং) জাহাঙ্গীর আলম চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কাছে চিঠি পাঠান। এতে ২০১৫ সালের ২০ এপ্রিল, ২০১৭ সালের ৭ মার্চ ও ১৬ এপ্রিল, ২০১৮ সালের ৫ এপ্রিল এবং ২০১৯ সালের ৩০ জুন সম্পাদিত ট্রাকশন মোটর মেরামতসংক্রান্ত চুক্তির সব নথির সত্যায়িত অনুলিপি চাওয়া হয়।

অভিযোগ অস্বীকার রেলের

তবে ঠিকাদার আফসার আলী বিশ্বাসকে সুবিধা দেওয়া বা তাঁর সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসাজশের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন। গত ২৮ জুলাই রেল ভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ই-জিপি পদ্ধতিতে যোগ্যতাসম্পন্ন ঠিকাদাররা দরপত্রে অংশ নেন এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেই কাজ পান।

রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) ফকির মো. মহিউদ্দিনও বলেন, টেন্ডারের সব শর্ত পূরণ করেই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, ট্রাকশন মোটর মেরামতের কাজে নতুন করে আরও দুটি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে ট্রাকশন মোটর মেরামতের দরপত্র, যোগ্যতা নির্ধারণ, কার্যাদেশ প্রদান এবং সরকারি কারখানা ব্যবহারের অভিযোগগুলো নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। দুদকের তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটা, নাকি পুরো প্রক্রিয়াই প্রচলিত ক্রয়বিধি মেনে হয়েছে—তা স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।