ঢাকা, শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ১১:৩২:৫৪ PM

কাজী সুলতানা দম্পতির ‘সম্পদের পাহাড়

স্টাফ রিপোটার।। করাপশনমিরর.কম
08-08-2026 03:33:53 PM
কাজী সুলতানা দম্পতির ‘সম্পদের পাহাড়

বিসিএস (শুল্ক ও আবগারি) ক্যাডারের কর্মকর্তা কাজিয়া সুলতানা (পরিচিতি নম্বর–৩০০২৮৫) সম্প্রতি যুগ্ম কমিশনার (গ্রেড-৫) পদে পদোন্নতি পেয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে পদায়ন পেয়েছেন। তার পদোন্নতি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন অনুসন্ধান ও সূত্রের বরাতে তার এবং তার স্বামী শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা মহিউদ্দীন আহমেদ মুরাদের নামে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

রাজধানী ও গ্রামে বিপুল সম্পদের অভিযোগ

অনুসন্ধানী তথ্যে দাবি করা হয়েছে, কাজিয়া সুলতানা ও মহিউদ্দীন আহমেদ মুরাদের নামে রাজধানী ঢাকা এবং গ্রামের বাড়িতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ৩১ মার্চ খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আফতাবনগরের জহুরুল ইসলাম সিটির এফ ব্লকের (সেক্টর-১, রোড-৩, বাড়ি-১৯) তিন কাঠার একটি প্লট মহিউদ্দীন আহমেদের নামে রেজিস্ট্রি করা হয়। দলিলে প্লটটির মূল্য ১৭ লাখ ২৬ হাজার টাকা দেখানো হলেও প্রকৃত ক্রয়মূল্য প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ছিল বলে সূত্রের দাবি। ওই জমিতে আনুমানিক ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে আটতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। ভবনটি থেকে প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ভাড়া আসে বলে অনুসন্ধানী তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

এ ছাড়া রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই ব্লকে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের ২,৪০০ বর্গফুটের একাধিক ফ্ল্যাট থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই এলাকার এল ব্লকে তাদের নামে ১২ কাঠার একটি প্লট রয়েছে বলেও সূত্রের দাবি। বর্তমান বাজারমূল্যে ওই জমির মূল্য প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে একটি বাগানবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া উত্তর বাড্ডার বিটিআই শপিংমলে ‘স্টাইল এমকে’ নামে দুটি দোকান থাকার তথ্যও উঠে এসেছে। এসব দোকান আনুমানিক ৮০ থেকে ৯০ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। রাজধানীর উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরে সাড়ে চার কাঠা জমি, একাধিক ব্যক্তিগত গাড়ি এবং গ্রামের বাড়িতে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি ডুপ্লেক্স ভবনের তথ্যও অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে বলে সূত্রের দাবি।

পদায়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন

কাজিয়া সুলতানার কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় পদে দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, এনবিআরের সাবেক সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেনের প্রভাবের কারণে তিনি দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

সূত্রের দাবি, আইসিডি কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে সমসাময়িক কর্মকর্তাদের তুলনায় তার পদোন্নতি বিলম্বিত হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট ও ঢাকা পশ্চিম ভ্যাট কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনের সময়ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিভিন্ন ফাইল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ বা নথি রয়েছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।

পদোন্নতি নিয়ে নতুন বিতর্ক

এত অভিযোগের মধ্যেই গত ২২ জুন জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কাজিয়া সুলতানাকে বিসিএস (শুল্ক ও আবগারি) ক্যাডারের যুগ্ম কমিশনার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পরে তাকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে পদায়ন করা হয়।

বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে এলেও এসব অভিযোগের বিষয়ে এনবিআরের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে কাজিয়া সুলতানা ও তার স্বামী মহিউদ্দীন আহমেদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তাদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর বন্ধ থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের অবস্থানও জানা সম্ভব হয়নি।

দুদক সংস্কার কমিশন ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-সংশ্লিষ্টদের মতে, শুল্ক ও কর প্রশাসনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এ ধরনের অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া জরুরি। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা গেলে প্রকৃত তথ্য সামনে আসবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও তৈরি হওয়া প্রশ্নের অবসান ঘটবে। রাজস্ব প্রশাসনে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য তাই বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।