ঢাকা, রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৮:২৯:৩২ AM

যুবদলের সদ্য ঘোষিত কমিটি ঘিরে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে

স্টাফ রিপোটার।। করাপশনমিরর.কম
22-07-2026 08:20:36 AM
যুবদলের সদ্য ঘোষিত কমিটি ঘিরে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে

জাতীয়তাবাদী যুবদলের সদ্য ঘোষিত কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিকে ঘিরে সংগঠনের ভেতরে ও বাইরে সমালোচনা এবং বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর থেকেই পদবণ্টনে স্বজনপ্রীতি, আন্দোলনে নিষ্ক্রিয় ব্যক্তিদের মূল্যায়ন, বিতর্কিত ও মামলাভুক্ত নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া এবং ত্যাগী নেতাদের বঞ্চিত করার অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে কমিটি পুনর্বিবেচনার দাবিতে পদবঞ্চিত নেতাদের কর্মসূচিও চলমান রয়েছে।

জানা গেছে, ২০২৪ সালে আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে প্রায় ২৩ মাস পর, গত ৪ জুন, ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি প্রকাশ করা হয়। সংগঠনের একাধিক নেতার দাবি, অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে না পারা বর্তমান নেতৃত্বের সাংগঠনিক দুর্বলতারই প্রতিফলন।

জরুরি সভায় উত্তেজনা

সদ্য ঘোষিত কমিটিকে ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই ৬ জুলাই নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যুবদলের একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিতর্কিত ও নিষ্ক্রিয় নেতাদের বিষয়ে আলোচনা করা। তবে বৈঠকের একপর্যায়ে সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে শেষ পর্যন্ত সভা স্থগিত করতে হয়।

সভায় উপস্থিত একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন কমিটিতে বিতর্কিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির দায় নিয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক একে অপরকে দোষারোপ করতে থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, সভাপতি কয়েকজন সহসভাপতির রাজনৈতিক অতীত ও সাংগঠনিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং মন্তব্য করেন যে অনেক ত্যাগী নেতাকে বাদ দিয়ে কেবল সাধারণ সম্পাদকের ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে কয়েকজনকে পদ দেওয়া হয়েছে। এর জবাবে সাধারণ সম্পাদকও সভাপতির সুপারিশে অন্তর্ভুক্ত কয়েকজন নেতার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। একপর্যায়ে উভয়ের মধ্যে উত্তপ্ত বাকবিনিময় শুরু হয় এবং সভাপতি পদত্যাগের ইচ্ছাও প্রকাশ করেন বলে সভায় উপস্থিত কয়েকজন নেতা দাবি করেছেন।

সভাকক্ষের বাইরে অবস্থানরত একাধিক কেন্দ্রীয় নেতাও ওই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তাদের মতে, কমিটির মান ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নেতৃত্বের মধ্যেই বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা সংগঠনের ভাবমূর্তির জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

পদবঞ্চিতদের ক্ষোভ

পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর থেকেই পদবঞ্চিত নেতারা ধারাবাহিকভাবে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থেকেও তারা মূল্যায়ন পাননি। সম্প্রতি তারা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের অভিযোগ তুলে ধরেন এবং কমিটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানান। একই সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

বিতর্কিতদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ

যুবদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের অভিযোগ, ১৫১ সদস্যের নির্বাহী কমিটির প্রায় অর্ধশতাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ রয়েছে। কারও বিরুদ্ধে হত্যা মামলার আসামি হওয়ার অভিযোগ, কারও বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগ, আবার কারও বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, প্রতারণা কিংবা স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে পদ লাভের অভিযোগ উঠেছে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি প্রথম সহসভাপতি জিয়াউর রহমান জিয়াকে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি অতীতে একটি হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় কারাভোগও করেছেন। এ ধরনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে সংগঠনের প্রথম সহসভাপতির দায়িত্ব দেওয়ায় অনেক নেতাকর্মী অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে জিয়াউর রহমান জিয়া এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন।

এছাড়া কয়েকজন সহসভাপতির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন রাজনীতি ও আন্দোলনে নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে। সংগঠনের একাংশের দাবি, কেউ বিদেশে অবস্থান করেও গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন, কেউ আবার দীর্ঘ সময় কোনো কর্মসূচিতে অংশ না নিয়েও পদোন্নতি লাভ করেছেন। কিছু নেতার বিরুদ্ধে ব্যবসায়িক স্বার্থ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা শীর্ষ নেতাদের ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে পদ পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে অতীতে বিএনপির নীতির বিরোধিতা, সংস্কারপন্থী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা এবং দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী আচরণের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও অভিযুক্তদের অনেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এগুলোকে ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত বলে দাবি করেছেন।

নেতৃত্বের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

সংগঠনের একাধিক নেতার অভিযোগ, সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন নিজেদের অনুসারী ও ঘনিষ্ঠদের অগ্রাধিকার দিয়ে কমিটি গঠন করেছেন। এর ফলে দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় এবং সাংগঠনিকভাবে পরীক্ষিত অনেক নেতা পদবঞ্চিত হয়েছেন। এই সিদ্ধান্তে তৃণমূল পর্যায়ে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

অন্যদিকে নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠদের দাবি, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ের মতামত বিবেচনা করা হয়েছে এবং সব অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি বড় রাজনৈতিক দলের সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে এ ধরনের প্রকাশ্য বিতর্ক সংগঠনের সাংগঠনিক ঐক্য ও ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে নেতৃত্বের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ এবং পদবণ্টন নিয়ে অসন্তোষ দীর্ঘমেয়াদে সাংগঠনিক কার্যক্রমকে দুর্বল করতে পারে। তাদের মতে, অভিযোগগুলো যদি নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা হয় এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহলে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সংকট অনেকটাই নিরসন হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটিকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং পদবঞ্চিত নেতাদের আন্দোলন সংগঠনটির জন্য একটি বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এখন দলীয় উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগই নির্ধারণ করবে এই বিতর্ক কত দ্রুত এবং কীভাবে সমাধানের দিকে এগোবে।