ঢাকা, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ১০:৩৬:১৫ PM

সুর, সত্য ও দূর আকাশের প্রেম: জন্মদিনে জেমস

আফসানা আরেফিন
03-10-2026 09:34:00 PM
সুর, সত্য ও দূর আকাশের প্রেম: জন্মদিনে জেমস

জীবন যখন ছকে বাঁধা নিয়মের মধ্যে আটকে পড়তে চায়, তখন কিছু কণ্ঠ এসে শিকল ভাঙতে শেখায়। যে বয়সে দূরন্ত কৈশোর কাটে রঙিন কল্পনায়, মেয়েরা আনমনে প্রেমে পড়ে, অনুভূতির প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে বয়ে যায় অজানা দোলা ঠিক সেই বয়সে আমি প্রেমে পড়েছিলাম এক অলৌকিক সুরের। না, তিনি কোনো পরিচিত অলির অলিগলি কাঁপানো রাজপুত্র ছিলেন না তিনি ছিলেন সুরের রাজপুত্র, নগরের বাউল, আমাদের জেমস। কিন্তু এই প্রেম শারীরিক বা সাধারণ কোনো ভালোলাগা ছিল না। এ ছিল এক অচেনা মহাজাগতিক টান। দূরের কোনো অলৌকিক কিছুকে ভালোবাসার যে দৃঢ় বিশ্বাস ও অফুরন্ত মনোবল তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল জেমসের গান শুনেই।
​তিনি শুধু আমাদের ভালোবাসতে শেখাননি, শিখিয়েছেন জীবনকে কীভাবে মুখোমুখি দেখতে হয়। যখন পুরো দুনিয়া বস্তুগত চাওয়া-পাওয়ার মোহে আচ্ছন্ন তখন একজোড়া ইয়ারফোনে তাঁর কণ্ঠ বেজে উঠলেই মনে হতো এই পৃথিবীর বাইরেও আরও এক পৃথিবী আছে যা নির্লোভ, যেখানে শর্তহীন টানের বাইরে আর কিছুর অস্তিত্ব নেই। জেমসের জন্মদিনে তাই তাঁর সুর, দর্শন ও জীবনের ক্যানভাসজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সেই মায়াবী প্রভাবকে ফিরে দেখা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা নয় এ এক নিজের শেকড় ও আত্মাকে নতুন করে ছোঁয়ার অনুভূতির প্রকাশ।

​প্রেম মানেই যে কেবল প্রসাধন, উপহার, কিংবা পার্কের বেঞ্চে বসে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা নয় এই রূঢ় অথচ সুন্দর সত্যটা তিনি আমাদের মাথার ভেতরে গেঁথে দিয়েছেন অজান্তেই। তাঁর গান আমাদের শিখিয়েছে, প্রেম হলো এক ধরণের তপস্যা, এক ধরণের আধ্যাত্মিক যন্ত্রণা যা মানুষকে ভেতরের দিক থেকে খাঁটি করে তোলে।
​সেই কৈশোরে যখন সাধারণ প্রেম প্রস্তাবে বন্ধুদের চোখমুখ লাজে রাঙা হতো কিংবা ছেলেরা রূপালী চিঠিতে মন গলানোর চেষ্টা করত তখন জেমসের প্রেমে বুঁদ হয়ে থাকা আমার কাছে ওই প্রস্তাবগুলোকে বড্ড বেশি সাধারণ, একঘেয়ে আর ‘দুষ্টু ছেলেদের’ সস্তা ছলনা মনে হতো। পুরুষালি চাটুকারিতা কিংবা প্রেমের নামে ছড়ানো এই অগভীর আকর্ষণগুলোর প্রতি এক ধরণের অনীহা ও বিতৃষ্ণাভাব তৈরি হয়েছিল তাঁর গানের গম্ভীর ও গভীর ভাবাদর্শের কারণে। 

​জেমসের গান জীবনকে কোনো রূপকথার গল্প হিসেবে উপস্থাপন করেনি। সেখানে আছে রাজপথের ধুলোবালি, বস্তির ক্রন্দন, নিঃসঙ্গ রাতের দীর্ঘশ্বাস, আবার একই সাথে আছে আকাশের মতো বিশাল এক স্বাধীনতার ডাক, সরল বাংলাদেশের উপাখ্যান।  জীবন সম্পর্কে এক কঠিন ও বাস্তবমুখী শিক্ষা আমরা তাঁর কাছ থেকেই পাই। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন প্রাপ্তির চেয়ে হাহাকার অনেক বেশি খাঁটি হতে পারে এবং হারানোর মধ্যেও থাকতে পারে এক মহৎ সার্থকতা।
​​জেমসের গানকে কেবল ‘রক মিউজিক’ বললে তাঁর বিশালতাকে অত্যন্ত সংকুচিত করে ফেলা হয়। গিটারের চড়া সুর আর ড্রামসের বিটের নিচে লুকিয়ে থাকে এক সুগভীর আধ্যাত্মিক চেতনা। সুফিবাদের যে আবহ তিনি বাংলা রকে নিয়ে এসেছেন, তা অনন্য। ‘মীরাবাই’, ‘পাগলা হাওয়া’, ‘গুরু ঘর বানাইলা কি দিয়া’ কিংবা ‘সুস্মিতার মন’—প্রতিটি গানেই পার্থিব প্রেমের খোলস ছাড়িয়ে ফুটে ওঠে এক অপার্থিব আকুলতা।
​তিনি যখন গান গান তখন মনে হয় এক বাউল আধুনিক নগরে এসে গিটার হাতে নিয়ে স্রষ্টা ও সৃষ্টির সাঁকো বাঁধছেন। তাঁর সেই অদ্ভুত কণ্ঠস্বর যেন পার্থিব সীমানা ছাড়িয়ে অন্য এক জগতের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়।
​“পাগলা হাওয়ার তোড়ে
মাটির প্রদীপ নিভে যায়...”
​এই কথার ভেতরে যে জীবন দর্শনের চরম সত্য নিহিত আছে তা কোন পাঠ্যবই আমাদের শেখাতে পেরেছে? জীবনের নশ্বরতা, ভালোবাসার অমরতা এবং নিয়তির কাছে মানুষের অসহায়ত্ব এই সবকিছুর মিশেলে যে পরাবাস্তববাদী পরিবেশ তিনি তৈরি করেন তা আমাদের ভেতরটাকে নির্লোভ করে তোলে। পার্থিব ধুলোবালি, লোভ, লালসা ও প্রদর্শনে ভরা দুনিয়া থেকে ক্ষণিকের জন্য হলেও আমাদের আত্মাকে মুক্ত করে এক অপার্থিব অনুভূতির দিকে নিয়ে যায়।

​দূরত্ব যে ভালোবাসাকে আরও বেশি গভীর করতে পারে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ জেমস নিজে। ভক্তদের সাথে তাঁর যোগাযোগ কোনো কৃত্রিম প্রচারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। তিনি খুব বেশি কথা বলেন না, মিডিয়ার ঝলকানিতে নিজেকে বিলিয়ে দেন না বরং নিজের চারপাশে এক ধরণের নির্জনতার বলয় তৈরি করে রাখেন। আর এই নিঃসঙ্গতাই তাঁকে করে তুলেছে আরও বেশি রহস্যময় ও আকর্ষণীয়।
​তাঁকে দেখে আমরা শিখেছি কোনো কিছুকে সত্যি সত্যি ভালোবাসতে হলে তাকে স্পর্শ করতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। দূরের কোনো নক্ষত্রকে যেমন ছোঁয়া যায় না কিন্তু তার আলোতেই আলোকিত হয় রাতের আকাশ জেমসও ঠিক তেমনই এক নক্ষত্র। তাঁর গান আমাদের শিখিয়েছে দূরত্বের প্রেম কীভাবে মানুষকে আত্মিক দিক থেকে শক্ত করে তোলে। নির্লোভভাবে কাউকে ভালোবেসে যাওয়া কোনো প্রতিদানের আশা না করে কেবল সুরের সুতোয় জীবনকে বেঁধে রাখা এই বিরল মনোবল আমরা তাঁর গান থেকেই লাভ করেছি।

​জেমস কেবল একজন সংগীতশিল্পী নন, তিনি একটি প্রজন্মের আবেগ, প্রতিবাদ এবং নির্জনতার আশ্রয়। আশির দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বাংলা গানের ধারায় তিনি যে পরিবর্তন এনেছেন তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মা, বাবা, স্যার, দুখিনী এমন কোনো সত্তা নেই যা নিয়ে তিনি গান গায়নি। একজন মানুষ সব সত্তাকেই যখন লালন করেন তখনই সে কেবল বড় আশ্রয়।একজন সেরা শিল্পী তো অবশ্যই সকল সত্তাকে ছুৃঁয়ে যাবেন এটাই মানুষের প্রত্যাশা। ক্ষোভ, হতাশা, একাকীত্ব এবং ভাঙচুরের ভেতরেও কীভাবে একটি সুন্দর ও নিখাদ বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, জেমসের গান তার জীবন্ত দলিল।
​যখন এই সমাজ, এই শহরের ব্যস্ততা আমাদের শ্বাসরোধ করে তোলে, যখন চারপাশের ভণ্ডামি আর কৃত্রিমতা আমাদের ক্লান্ত করে ফেলে তখন জেমসের গানই হয়ে ওঠে একমাত্র উপশম। হেডফোনে গুরু যখন গর্জে ওঠেন, তখন মনে হয়—সব মিথ্যে, সব নশ্বর; কেবল এই সুর আর আমার ভেতরের আত্মাটাই সত্য।
​গুরু, তুমি অনন্তকাল থেকো। ​আজ সেই সুরের জাদুকরের জন্মদিন। যে মানুষটি নিজের কণ্ঠ দিয়ে লক্ষ-কোটি হৃদয়ে ভালোবাসার চারা রোপণ করেছেন, জীবনকে নতুন চোখে দেখতে শিখিয়েছেন, তাঁকেই জানাই হৃদয়ের গভীরতম কোণ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও জন্মদিনের শুভেচ্ছা।
​শুভ জন্মদিন, নগর বাউল! শুভ জন্মদিন, আমাদের গুরু!
​আপনি আমাদের যে নির্লোভ পরাবাস্তববাদ শিখিয়েছেন, যে আধ্যাত্মিক টানে ভাসাতে শিখিয়েছেন, তা আমাদের আজীবন খাঁটি মানুষ হয়ে বাঁচার শক্তি জোগাবে। জাগতিক সব মোহ থেকে দূরে গিয়ে দূরের কোনো সত্যকে ভালোবাসার যে মনোবল আপনি আমাদের দিয়েছেন, তার জন্য আমরা আপনার কাছে চিরঋণী। আপনার জীবন দীর্ঘ হোক, আপনার গিটারের তারে তারে আরও বহুকাল ঝঙ্কৃত হোক মহাজাগতিক সেই প্রেম ও মুক্তির গান।

লেখক : কবি, সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও এমফিল গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।