দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি মিডিয়া হাউজের পরিচালনাধীন একটি জনপ্রিয় অনলাইন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানসিক নির্যাতন এবং প্রতিশোধমূলক চাকরিচ্যুতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী এক সাবেক নারী প্রতিবেদক বিচার ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) এবং ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামসহ (সিএমজেএফ) বেশ কয়েকটি সাংবাদিক ও নারী সংগঠনের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। একই সাথে তিনি বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মিডিয়া হাউজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) অবগতির জন্যও পাঠিয়েছেন।
অভিযোগকারী ওই নারী সাংবাদিক স্পষ্ট করেছেন যে, তাঁর এই লড়াইয়ের উদ্দেশ্য চাকরিতে পুনর্বহাল হওয়া নয়; বরং কর্মস্থলে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অন্যায় প্রতিশোধমূলক আচরণের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা।
ঘটনার বিবরণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি
লিখিত অভিযোগে ভুক্তভোগী সাংবাদিক জানান, ২০২৫ সালের মে মাস থেকে অভিযুক্ত সম্পাদক বিভিন্ন অজুহাতে তাঁকে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিজ কক্ষে ডেকে পাঠাতেন। সংবাদমাধ্যমের প্রচলিত রিপোর্টিং প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে তাকে ব্যক্তিগত কিছু দায়িত্বও দেওয়া হতো। একপর্যায়ে সংবাদ পরিকল্পনার কথা বলে ওই সম্পাদক তাকে কার্যালয়ের বাইরে 'জিন্দা পার্ক'-এ নিয়ে যান। অভিযোগ অনুযায়ী, সেখান থেকে ফেরার পথে গাড়িতে অবস্থানকালে অভিযুক্ত সম্পাদক তাঁর সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক ঘনিষ্ঠতার চেষ্টা করেন।
এছাড়া, আরও একটি স্থানে (‘ডিম হলিডে’) নিয়ে গিয়ে উক্ত সম্পাদক তাঁকে অনৈতিক প্রস্তাব দেন এবং ধর্ষণের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর দাবি, অফিসে কাজের ছলে বা বিভিন্ন বাহানায় অভিযুক্ত সম্পাদক তাঁকে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেতেন এবং অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতেন।
শুধু সরাসরিই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ব্যক্তিগত ফোনকলের মাধ্যমেও তাঁকে বারবার বিরক্ত করা হতো। চ্যাটিং ও ফোনকলে যৌন সুরসুরি ও অস্বস্তিকর বার্তা পাঠানো এবং তাঁর ব্যক্তিগত ও যৌন জীবন নিয়ে নানা ধরনের আপত্তিকর আলোচনায় জড়ানোর চেষ্টা চালানো হতো।
প্রতিবাদ ও প্রতিশোধমূলক চাকরিচ্যুতি
অভিযোগপত্রে ভুক্তভোগী উল্লেখ করেন, সম্পাদক কর্তৃক অনৈতিক প্রস্তাব বারবার প্রত্যাখ্যান ও এসব আপত্তিকর আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর পর থেকেই তাঁর ওপর প্রতিশোধমূলক প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। তাঁকে মানসিকভাবে নির্যাতন করার পাশাপাশি পেশাগতভাবে কোনঠাসা করে ফেলা হয়।
পরবর্তীতে এর জের ধরেই তাঁকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। অথচ ঘটনার আগে তাঁর পেশাগত দক্ষতা নিয়ে কোনোদিন প্রশ্ন ওঠেনি। বরং প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় তাঁর করা দুটি বিশেষ প্রতিবেদন ‘বেস্ট রিপোর্ট’ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল এবং তিনি পুরস্কৃতও হয়েছিলেন। ফলে তাঁর চাকরিচ্যুতি যে কোনো পেশাগত ব্যর্থতার কারণে নয়, বরং আপোস না করার মাশুল ও প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ—তা স্পষ্ট।
আইনি ও সাংগঠনিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি
সংগঠনগুলোতে দেওয়া আবেদনে ওই সাংবাদিক জানান, তিনি প্রতিষ্ঠানে ও সাংবাদিক মহলে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছেন। পেশাগত ও সাংগঠনিক পর্যায়ে যদি তিনি সঠিক বিচার না পান, তবে সহকর্মীদের নিয়ে রাস্তায় মানববন্ধনসহ কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। প্রয়োজনে তিনি বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করবেন বলেও জানিয়েছেন।
অভিযোগকারী সাংবাদিক আরও দাবি করেছেন যে, অভিযুক্ত সম্পাদকের সাথে তাঁর ফোনালাপের অডিও রেকর্ড এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ বার্তা প্রেরণের উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ ও নথি তাঁর হেফাজতে রয়েছে। বিচার প্রক্রিয়ার প্রয়োজনে কিংবা উপযুক্ত সময়ে এসব প্রমাণ জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে।
প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া
এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে দেশের সার্বিক সাংবাদিক মহলে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। একাধিক অনানুষ্ঠানিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মিডিয়া হাউজটির অভ্যন্তরীণ উচ্চপর্যায়ে বেশ আলোচনা ও তোলপাড় শুরু হয়েছে। তবে এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি প্রদান করা হয়নি।
সংবাদ মাধ্যম অঙ্গনের অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মতে, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির অভিযোগ অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুতর বিষয়। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি এবং কর্মপরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থেই এসব অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। পেশাদার নীতিমালার আলোকে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে সত্যতা যাচাই ও অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হবে একমাত্র ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপ।