ঢাকা, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৯:১২:৫০ PM

ফেনীর খাল পুনঃখনন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।। করাপশনমিরর.কম
11-07-2026 12:38:27 PM
ফেনীর খাল পুনঃখনন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

ফেনী জেলার সাতটি গুরুত্বপূর্ণ খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, প্রকল্পের নির্ধারিত নকশা ও শর্ত উপেক্ষা করে অধিকাংশ স্থানে শ্রমিকের পরিবর্তে এক্সকাভেটর ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও কোথাও নির্ধারিত গভীরতা ও প্রস্থ বজায় না রেখে শুধু খালের পাড় ড্রেসিং, পানা ও ময়লা পরিষ্কার করেই খননকাজ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে। এতে সরকারের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় দরিদ্র শ্রমিকেরা কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। একই সঙ্গে প্রকল্পের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও সামনে এসেছে।

কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং খালপাড়ে বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি গ্রহণ করে সরকার। এই কর্মসূচির আওতায় ফেনীর ছয় উপজেলার ১২টি খালের প্রস্তাব দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এর মধ্যে সাতটি খাল অনুমোদন পায়। প্রায় ৪৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এসব খাল পুনঃখননের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা। প্রকল্পটি জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরু থেকেই নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী অধিকাংশ কাজ শ্রমিকের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সব জায়গায় ভারী যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে সরকারি কর্মসংস্থান কর্মসূচির উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে এবং কয়েক হাজার শ্রমিক কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। পাশাপাশি অপরিকল্পিতভাবে এক্সকাভেটর দিয়ে খনন করায় খালের দুই পাশের বসতবাড়ি ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সরেজমিনে ফেনী সদর, দাগনভূঞা, ফুলগাজী, পরশুরাম ও সোনাগাজী উপজেলার সাতটি খালে চলমান কাজ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির অধীনে পরিচালিত ৪০ দিনের কর্মসূচিতে কার্যত শ্রমিকের অংশগ্রহণ নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মোট ২ হাজার ৭৭৮ জন শ্রমিকের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করার কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি কাটা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, শ্রমিক দেখিয়ে ভুয়া মাস্টার রোল প্রস্তুত এবং জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব খোলার মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, খননকাজ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই বৃষ্টির পানিতে অনেক অংশ আবার ভরাট হয়ে যায়। এরপর প্রকৃত খননের পরিবর্তে শুধু খালের পাশ সমান করা, পানা পরিষ্কার ও সামান্য মাটি কাটার কাজ করে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি করা হচ্ছে। প্রকল্প নির্দেশিকায় অন্তত ৫০ শতাংশ শ্রমিক ব্যবহার বাধ্যতামূলক থাকলেও বাস্তবে সে নির্দেশনা মানা হয়নি। ফেনী সদর উপজেলার শর্শদিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পরিদর্শনের আগে স্থানীয় কয়েকজনকে এক দিনের জন্য শ্রমিক হিসেবে উপস্থিত করার অভিযোগও উঠেছে।

ফেনী সদর উপজেলার দাউদপুর খাল থেকে ছোট ফেনী নদী পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার খননের জন্য ২ কোটি ৫৭ লাখ ৫২ হাজার ৭৭৫ টাকা এবং শর্শদি থেকে মোহাম্মদ খাল পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার খননের জন্য ১ কোটি ৪৬ লাখ ৮০ হাজার ৯৩১ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প অনুযায়ী প্রথমটিতে প্রতিদিন ৫৯৫ জন এবং দ্বিতীয়টিতে ৩৩৯ জন শ্রমিক কাজ করার কথা থাকলেও সরেজমিনে কোনো শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, সম্পূর্ণ কাজই যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে।

দাগনভূঞা উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের জয়নারায়ণপুর-বিরলী খাল এবং জায়লস্কর ইউনিয়নের সিলোনিয়া বাজার-নেয়াজপুর খালের প্রতিটির দৈর্ঘ্য ২ কিলোমিটার। প্রতিটি প্রকল্পে ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দুটি প্রকল্পে প্রতিদিন মোট ২৩৮ জন শ্রমিক নিয়োজিত থাকার কথা থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, পুরো কাজই এক্সকাভেটর দিয়ে করা হয়েছে।

ফুলগাজী উপজেলার নোয়াপুর এলাকার গতিয়া খাল থেকে সিলোনিয়া খাল পর্যন্ত ২ কিলোমিটার পুনঃখনন প্রকল্পেও একই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী শ্রমিক ও যন্ত্রের সমন্বয়ে কাজ হওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, সেখানে মূলত যন্ত্র দিয়েই নামমাত্র খননকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।

পরশুরাম উপজেলার দক্ষিণ টেটেশ্বর থেকে কহুয়া নদীর সংযোগস্থল পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার খাল পুনঃখননে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৭৭ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ টাকা। প্রতিদিন ১৭৮ জন শ্রমিক নিয়োগের কথা থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে কোনো শ্রমিককে কাজে দেখা যায়নি।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে সোনাগাজী উপজেলার দাঙ্গাই খাল প্রকল্প নিয়ে। ২২ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার ৯৪৫ টাকা। প্রকল্পে প্রতিদিন ১ হাজার ৩০৯ জন শ্রমিক এবং অবশিষ্ট কাজ যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানেও শ্রমিক ব্যবহার করা হয়নি। আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাবে খালের নাম ও অবস্থান পরিবর্তন করা হলেও দৈর্ঘ্য উল্লেখ করা হয়নি। অথচ আগের ২২ কিলোমিটারের জন্য নির্ধারিত একই ব্যয় বহাল রাখা হয়েছে।

একজন অভিজ্ঞ জরিপকারীর সহায়তায় সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সার্ভে (বিএস) নকশা অনুসারে প্রকল্প এলাকার প্রকৃত খালের রৈখিক দৈর্ঘ্য মাত্র ৪ দশমিক ৬২ কিলোমিটার। সংশ্লিষ্ট নকশায় দেখা যায়, এর পরবর্তী অংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এবং তা সরকারি খালের আওতায় পড়ে না। এ অবস্থায় প্রকল্পের দৈর্ঘ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও একই পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দাবি, নির্দেশিকা অনুযায়ী বরাদ্দ অপরিবর্তিত রেখে প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের পরিধি পরিবর্তন হলে ব্যয়ও নতুনভাবে নির্ধারণ করা উচিত। তাদের মতে, সংশোধিত প্রকল্প বাস্তবায়নে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ের প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়।

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প শুরুর আগে অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সংগ্রহ করা হলেও তাদের কাউকেই কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে শ্রমিকদের নামে খোলা ব্যাংক হিসাব, মাস্টার রোল এবং স্বাক্ষরের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভুয়া হিসাব ও কাগুজে শ্রমিক দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করা হচ্ছে।

স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের দাবি, খালগুলো যথাযথভাবে পুনঃখনন করা হলে কৃষি সেচ, পানি নিষ্কাশন এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে বড় ধরনের সুফল পাওয়া যেত। কিন্তু নিম্নমানের কাজ, প্রকল্পের শর্ত লঙ্ঘন এবং অনিয়মের কারণে সেই সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে। বৃষ্টির কয়েক দিনের মধ্যেই কাটা মাটি আবার খালে পড়ে যাওয়ায় কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকল্পের আর্থিক নিরীক্ষা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।