ঢাকা, রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৭:২১:৩৭ PM

অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউজে কেলেঙ্কারি করেও বহাল

স্টাফ রিপোটার।। করাপশনমিরর.কম
15-07-2026 03:08:36 PM
অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউজে কেলেঙ্কারি করেও বহাল

অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির মালয়েশিয়াভিত্তিক বিদেশি সহযোগী প্রতিষ্ঠান অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউজের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা অনিয়মের মাধ্যমে গ্রহণ, প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, ভুয়া ব্যয়ের কাগজপত্র তৈরি এবং দোকানভাড়ার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পরও তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুলতান আহমেদসহ কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে নিয়োগ নীতিমালা লঙ্ঘন করে নির্ধারিত সময়ের আগেই পরিবারকে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়া, অবৈধভাবে চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষাভাতা গ্রহণ, প্রতিষ্ঠানের অর্থে ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানি ও টোল বিল পরিশোধ এবং অনুমোদনবিহীন বিভিন্ন খাতে ব্যয় দেখানো।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিয়োগের শর্তে বিদেশে কর্মরত কর্মকর্তাদের দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে পরিবার সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। কিন্তু সুলতান আহমেদ দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই পরিবারকে মালয়েশিয়ায় নিয়ে যান। এরপর তিনি প্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসা সুবিধা ও সন্তানদের শিক্ষা ভাতা গ্রহণ করেন, যা নির্ধারিত নীতিমালার পরিপন্থী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ির জ্বালানি ও টোল ব্যয় প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া নতুন শাখা অনুসন্ধানের নামে ভ্রমণ ব্যয় দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হলেও সেই ব্যয়ের পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা গ্রহণযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, ভ্রমণ ব্যয়ের জন্য ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দোকানভাড়া বাবদ প্রাপ্ত অর্থ সংশ্লিষ্ট হিসাবে জমা না দিয়ে সুলতান আহমেদ ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করেছেন। নিরীক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ অর্থ প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা দেওয়ার পরিবর্তে ব্যক্তিগতভাবে সংরক্ষণ করে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে।

অগ্রণী রেমিট্যান্স হাউজ এসডিএন বিএইচডি, মালয়েশিয়ায় পরিচালিত নিরীক্ষায় মোট সাতটি অডিট আপত্তিতে এক লাখ ২৪ হাজার ১৬৮ দশমিক ৩৭ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতের অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ৪৬ হাজার ৬৪১ রিঙ্গিত আদায় করা হয়। পরে কর্তৃপক্ষের চাপের মুখে বাকি অর্থও সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, মোট অনিয়মের মধ্যে একাই সাবেক সিইও ও পরিচালক সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধে ৫২ হাজার ৯৪৩ রিঙ্গিতের আর্থিক অনিয়মের দায় নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া সাবেক সিইও খালেদ মোরশেদ রিজভীর বিরুদ্ধে ১৬ হাজার ৫৮৪ রিঙ্গিত, সাবেক সিইও লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে ৬ হাজার রিঙ্গিত এবং সাবেক সিইও ওয়ালী উল্লাহর বিরুদ্ধে ২ হাজার রিঙ্গিত অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।

এছাড়া শাখা পরিদর্শনের নামে পরিবহন ব্যয়, যথাযথ অনুমোদন ছাড়া প্রশিক্ষণ ব্যয় এবং বোর্ড সভায় উপস্থিতি ভাতা গ্রহণের ক্ষেত্রেও নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। শুধু বোর্ড সভার উপস্থিতি ভাতা বাবদ অতিরিক্ত উত্তোলিত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার রিঙ্গিত, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি রিঙ্গিত ৩০ টাকা হিসাবে) ৯ লাখ টাকারও বেশি।

জানা গেছে, নিরীক্ষা চলাকালে এবং প্রতিবেদন প্রকাশের পর সুলতান আহমেদ বেশ কিছু অর্থ প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ফেরত জমা দেন। তবে ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানের অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে ব্যবহার করে পরে অডিট আপত্তির মুখে তা ফেরত দিলেই দায়মুক্তি পান না। তাদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড তহবিল তছরুপের শামিল এবং প্রচলিত আইন ও ব্যাংকিং বিধিমালা অনুযায়ী এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সূত্র জানায়, তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর সুলতান আহমেদকে অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউজ, মালয়েশিয়া থেকে ঢাকায় অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ফিরিয়ে আনা হয়। তবে অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সুলতান আহমেদ শীর্ষনিউজ ডটকমকে বলেন, “বিষয়গুলো অনেক আগেই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। অফিসিয়ালভাবে কিছু অডিট আপত্তি উঠেছিল। সে সময় যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, আমরা তা যথাযথভাবে পালন করেছি।”

অন্যদিকে, সুলতান আহমেদসহ অনিয়মে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—এ বিষয়ে জানতে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ারুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে ব্যাংকের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা সিদ্ধান্ত প্রকাশ না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট মহলে জবাবদিহি, সুশাসন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।