দীর্ঘ দেড় যুগের আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা, কারাবরণ, গুম-নির্যাতন এবং অসংখ্য ত্যাগ-তিতিক্ষার পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। দলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা ছিল, ক্ষমতার পরিবর্তনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ত্যাগী কর্মীরা মূল্যায়িত হবেন। তবে ক্ষমতায় আসার পাঁচ মাস পরও সেই প্রত্যাশা অনেকাংশেই পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছ থেকে।
বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের একাধিক নেতা অভিযোগ করেন, মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়া কয়েকজন নেতা এখন দলীয় কর্মীদের থেকে দূরে সরে গেছেন। অনেকের আচরণে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, তারা আমলাদের পরামর্শেই চলছেন এবং দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ কমে গেছে। কোনো প্রয়োজন নিয়ে গেলে অনেকেই সাক্ষাৎ দেন না, ফোন ধরেন না, এমনকি খুদে বার্তারও উত্তর দেন না।
এক যুবদল নেতা জানান, ব্যক্তিগত একটি প্রয়োজন নিয়ে এক মন্ত্রীর কাছে গেলে তিনি সহযোগিতা না করে নানা অজুহাত দেন। মন্ত্রীর দপ্তরে গেলে এমন আচরণ করা হয় যেন তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের চিনতেই পারেন না। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন বিএনপির একাধিক কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতাও।
দলের একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, নির্বাচনের আগে মনোনয়ন নিশ্চিত করতে যারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন, তাদের অনেকেই এখন ফোন ধরেন না বা বার্তার জবাব দেন না। অথচ এসব নেতার অনেকেরই মনোনয়ন পাওয়াই একসময় অনিশ্চিত ছিল।
তবে নেতাকর্মীরা বলছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির রিজভী এবং মাহদী আমিনও নেতাকর্মীদের জন্য যেগাযোগের ক্ষেত্রে সহজ হলেও অনেকেই থাকেন নাগালের বাহিরে।
ফোন না ধরার বিষয়ে এক মন্ত্রী বলেন, তার পুরোনো নম্বরটি এপিএসের কাছে থাকে এবং বর্তমানে তিনি নতুন নম্বর ব্যবহার করছেন। অন্যদিকে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, তিনি সবসময় ফোন ধরার চেষ্টা করেন এবং কোনো নেতাকর্মীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেননি।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, মনোনয়ন বণ্টিতেও অনেক ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা বঞ্চিত হয়েছেন। বিভিন্ন আসনে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা নেতাদের বাদ দিয়ে তুলনামূলক কম পরিচিত বা কম সক্রিয় ব্যক্তিরা মনোনয়ন পেয়েছেন। তাদের কেউ কেউ পরে সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রীও হয়েছেন। এতে দলের ভেতরে অসন্তোষ আরও বেড়েছে।
শুধু বিএনপি নয়, জোটের নেতারাও একই অভিযোগ তুলেছেন। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নূরুল হক নুর ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকির সঙ্গে যোগাযোগ করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। নূরুল হক নুর অবশ্য দাবি করেছেন, তিনি নিয়মিত অফিস করেন; ব্যস্ততার কারণে সব সময় ফোন ধরতে পারেন না।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলেন, লাখো নেতাকর্মীর আত্মত্যাগের কারণেই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ব্যস্ততায় সব সময় ফোন ধরা সম্ভব না হলেও নেতাকর্মীদের অবদান কখনোই অস্বীকার করা যাবে না।
বাংলাদেশ সচিবালয় ঘুরে দেখা গেছে, অনেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর এপিএস অতীতে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। ফলে দলীয় নেতাকর্মীরা কোনো প্রয়োজনে মন্ত্রণালয়ে গেলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা সহজে প্রবেশাধিকার পান না বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাদের অভিযোগ, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেও অনেক জেলা নেতা যোগাযোগ করতে পারছেন না। অভিযোগ রয়েছে, তিনি অধিকাংশ সময় ফোন রিসিভ করেন না এবং সাংগঠনিক বিষয়েও দূরত্ব বজায় রাখেন। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে রুহুল কবির রিজভী বলেন, মন্ত্রীদের কাজের পরিধি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। ফলে সব সময় ফোন ধরা বা সবার সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয় না। এদিকে কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির লাখো নেতাকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং জুলাই আন্দোলনে শত শত নেতাকর্মী প্রাণ দিয়েছেন। বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে মাত্র পাঁচ মাস হয়েছে। ধাপে ধাপে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততার পাশাপাশি দলীয় সংগঠনের সঙ্গে মন্ত্রীদের যোগাযোগ আরও জোরদার হবে এবং দীর্ঘদিনের ত্যাগী কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হবে।