ঢাকা, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৮:১৯:২১ PM

ব্যাংকখাতে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির আশঙ্কা

স্টাফ রিপোটার ।। করাপশন মিরর.কম
23-06-2026 08:16:13 AM
ব্যাংকখাতে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির আশঙ্কা

দেশের ব্যাংকখাতে খেলাপিঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ, মূলধন ঘাটতি এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক সংকট মোকাবিলায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক মোট ২১ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা প্রদান করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন-২০২৫’ অনুযায়ী, এই সহায়তার মধ্যে প্রচলিত ব্যাংকগুলো পেয়েছে ১৯ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা এবং ইসলামী ব্যাংকগুলো পেয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া ১১টি ব্যাংককে জরুরি তারল্য সহায়তা হিসেবে আরও ১৮ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে এই সহায়তা ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা আর্থিক খাতের জন্য নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। তাই খেলাপিঋণ আদায়, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে রেপো অপারেশন, অ্যাশিউরড লিকুইডিটি সাপোর্ট (এএলএস), ইসলামী ব্যাংক লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি (আইবিএলএফ), স্পেশাল লিকুইডিটি সাপোর্ট (এসএলএস) এবং অন্যান্য তারল্য সুবিধার মাধ্যমে এই সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। তবে ব্যাংকখাতের প্রকৃত অবস্থা এখনও উদ্বেগজনক। বর্তমানে দেশের ব্যাংকখাতে খেলাপিঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা। এছাড়া উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে আরও ১ লাখ ৮২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করা হয়নি। ফলে প্রকৃত খেলাপিঋণের পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেওয়া তারল্য সহায়তার পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ২৬ দশমিক ২৩ শতাংশ কম। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক মোট ২৮ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দিয়েছিল। যদিও সহায়তার পরিমাণ কমেছে, তবুও এটি ব্যাংকখাতের একটি বড় অংশের তারল্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে।

প্রচলিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ২০২৫ সালে নিয়মিত তারল্য সুবিধার আওতায় ১৯ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে। এর মধ্যে ৫৯ দশমিক ১১ শতাংশ এসেছে রেপো সুবিধা থেকে, ৩৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ এএলএসের মাধ্যমে এবং ৪ দশমিক ২২ শতাংশ এসেছে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) থেকে। অন্যদিকে একই সময়ে এসব ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে স্থায়ী আমানত সুবিধা (এসডিএফ) হিসেবে ৫ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা জমা রেখেছে।

ইসলামী ব্যাংকগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে শরিয়াহভিত্তিক বিভিন্ন তারল্য সুবিধার আওতায় তারা মোট ১ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে ৮৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ এসেছে ইসলামী ব্যাংক লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি (আইবিএলএফ) থেকে এবং ৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ এসেছে স্পেশাল লিকুইডিটি সাপোর্ট (এসএলএস) থেকে। মুদারাবাহ লিকুইডিটি সাপোর্টের (এমএলএস) অবদান ছিল খুবই সীমিত। সামগ্রিক নিয়মিত তারল্য সহায়তার ৯১ দশমিক ৮৯ শতাংশ ব্যবহার করেছে প্রচলিত ব্যাংক এবং ৮ দশমিক ১১ শতাংশ ব্যবহার করেছে ইসলামী ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশের ব্যাংকখাতে মূলধন সংকটও গভীরতর হয়েছে। উচ্চ সুদহার, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের ধীরগতির কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। ২০২৪ সালে ব্যাংকখাতের ক্যাপিটাল টু রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) ছিল ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে নেমে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে মূলধন সংরক্ষণ বাফার প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত, বিশেষায়িত এবং কয়েকটি বেসরকারি ও ইসলামী ব্যাংকের দুর্বল আর্থিক অবস্থাই এ সংকটের প্রধান কারণ।

বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকখাত বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ খাতের সম্মিলিত সিআরএআর ঋণাত্মক ৪৩ দশমিক ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে এবং খেলাপিঋণ বেড়েছে ৫৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। যদিও পুনর্গঠন প্রক্রিয়াধীন পাঁচটি ব্যাংককে হিসাবের বাইরে রাখলে সিআরএআর দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ, তবুও আমানত ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি এবং শেয়ারহোল্ডারদের নেতিবাচক ইকুইটি উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে। পাশাপাশি অনেক ইসলামী ব্যাংক বাধ্যতামূলক তারল্য সূচক যেমন লিকুইডিটি কভারেজ রেশিও (এলসিআর), নেট স্ট্যাবল ফান্ডিং রেশিও (এনএসএফআর) এবং ইনভেস্টমেন্ট-ডিপোজিট রেশিও (আইডিআর) বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের স্ট্রেস টেস্টে দেখা গেছে, খেলাপিঋণ আরও বৃদ্ধি পেলে ব্যাংকগুলোর মূলধন পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে অবনতি ঘটতে পারে। বিশেষ করে বড় করপোরেট ঋণগ্রহীতাদের খেলাপিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি এখনও উচ্চ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মোট ঋণের প্রায় ৪৬ শতাংশ করপোরেট খাতে কেন্দ্রীভূত হলেও ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ৬৭ শতাংশ এই খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে করপোরেট ঋণের গুণগত মানের অবনতি পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ব্যাংকের বাইরের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৫ সালের শেষে এ খাতের খেলাপিঋণের হার বেড়ে ৩৩ দশমিক ৩২ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেমে ঋণাত্মক ২৩ দশমিক ১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং মোট আমানত কমেছে ৭ দশমিক ০৩ শতাংশ। বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের মুনাফাও নেতিবাচক হয়ে গেছে।

তবে সামগ্রিক অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, রপ্তানি আয় স্থিতিশীল রয়েছে এবং আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রিত থাকায় চলতি হিসাবের ভারসাম্যে উন্নতি হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। যদিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিএপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ২৮ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার।

এছাড়া এনপিএসবি, বিইএফটিএন, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, পেমেন্ট কার্ড, বিডি-আরটিজিএস, এজেন্ট ব্যাংকিং, বাংলা কিউআর এবং টাকাপে ব্যবহারের মাধ্যমে ডিজিটাল আর্থিক সেবার সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রদত্ত মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ ৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২২ লাখ ৮৪ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের ঋণ ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৭ লাখ ৪৭ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা এবং সরকারি খাতের ঋণ ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আমানত উত্তোলনের চাপ মোকাবিলায় নীতিমালার আওতায় বিশেষ তারল্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, এ উদ্যোগের ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর আর্থিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়েছে এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার হতে শুরু করেছে।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকরা মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা সাময়িক স্বস্তি দিলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনির মতে, ব্যাংকখাতের একটি অংশ এখনও নিজস্ব সক্ষমতায় তারল্য ব্যবস্থাপনা করতে পারছে না। একইভাবে অর্থনীতিবিদ ড. আব্দুল বায়েস বলেছেন, খেলাপিঋণের উচ্চহার, মূলধন ঘাটতি এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক সংকটের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে বাজারশৃঙ্খলা ও জবাবদিহিকে দুর্বল করতে পারে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য খেলাপিঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, সুশাসন নিশ্চিতকরণ, পেশাদার ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা, মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছ প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরুরি তারল্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে কমবে এবং দেশের ব্যাংকিং খাত আরও স্থিতিশীল ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে।