জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে গঠিত সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট’ (ইগঞঋ)–এ গুরুতর আর্থিক অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বকেয়া ভাতা প্রদানকে কেন্দ্র করে ট্রাস্টের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, অর্থ কেটে রাখা এবং হয়রানির অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযোগটি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, বকেয়া ভাতা প্রদান প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে ওঠে, যেখানে ট্রাস্টের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং কিছু মধ্যস্বত্বভোগী (দালাল) সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, এই চক্রের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য অর্থ ছাড় করার শর্ত হিসেবে প্রতি ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ঘুষ দাবি ও আদায় করা হয়েছে।
অভিযোগে ট্রাস্টের তিন কর্মকর্তার নাম বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তারা হলেন—ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. মাহবুবের রহমান, যুগ্ম পরিচালক (প্রশাসন) মো. ফয়েজ আহমেদ খান এবং সহকারী প্রধান হিসাব নিরীক্ষক আবুল হোসেন গাজী। এছাড়া তিনজন মুক্তিযোদ্ধা এবং একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন তাহাজ উদ্দিন, মো. নুরুল হুদা, মো. মাহবুবুর রহমান এবং ইফতেখার আহমেদ সবুজ।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘুষ আদায়ের জন্য একটি সংগঠিত সিন্ডিকেট তৈরি করা হয়। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের নথি দ্রুত নিষ্পত্তি ও বকেয়া ভাতা প্রদান নিশ্চিত করার বিনিময়ে অগ্রিম চেকের মাধ্যমে টাকা নেওয়া হয়। যেসব মুক্তিযোদ্ধা ঘুষ দিতে সম্মত হয়েছেন, তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সম্পূর্ণ বকেয়া ভাতা প্রদান করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবে একই ক্যাটাগরির অনেক মুক্তিযোদ্ধার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ টাকা প্রদান করা হয়নি; বরং তাদের প্রাপ্য অর্থ থেকে ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত কেটে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০০৩ সাল থেকে বকেয়া ভাতা প্রদানের বিষয়ে উচ্চ আদালতের একাধিক রিট মামলার রায় (মোট ১১টি রিট পিটিশন) অনুযায়ী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের ‘ডি’ ক্যাটাগরি থেকে ‘সি’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বকেয়া ভাতা পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু হলেও সেই প্রক্রিয়াকেই কেন্দ্র করে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রায় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে ঘুষ বাবদ কয়েক কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে। যেসব মুক্তিযোদ্ধা অগ্রিম চেক দিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত বকেয়া অর্থ—প্রায় ১৪,২৯,১৯০ টাকা—পরিশোধ করা হয়। একই সময়ে ঘুষ হিসেবে নেওয়া চেকগুলো নগদায়ন করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, প্রায় তিন শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার অ্যাকাউন্টে মার্চ মাসের শুরুতে বকেয়া অর্থ জমা হলেও তাদের মধ্যে অনেকেই সম্পূর্ণ অর্থ পাননি। অভিযোগ অনুযায়ী, কেউ পেয়েছেন ১০,৭৯,১৯০ টাকা, আবার কেউ পেয়েছেন ১১,২৯,১৯০ টাকা। অর্থাৎ একই রায়ের আওতায় একই ক্যাটাগরির মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ভাতার পরিমাণে বৈষম্য করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, এই বৈষম্য ও অর্থ কেটে রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও তারা সন্তোষজনক কোনো উত্তর দেননি। বরং অভিযোগকারীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘সি’ ক্যাটাগরির গেজেট বাতিল বা তাদের মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ভুক্তভোগীরা প্রথমে ট্রাস্টের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদেরকে দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ট্রাস্টের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করলেও একই ধরনের নির্দেশনা পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়। এরপর মুক্তিযোদ্ধারা নিজেরাই বিষয়টি অনুসন্ধান করে অনিয়মের চিত্র উদঘাটনের চেষ্টা করেন।
এই পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী মুক্তিযোদ্ধারা দাবি করেছেন, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি অর্থ বণ্টনে চরম অনিয়ম করা হয়েছে। তারা বলেন, যারা ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাদের ন্যায্য প্রাপ্য অর্থ থেকে অর্থ কেটে রাখা হয়েছে এবং তাদেরকে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীরা আরও অভিযোগ করেন, যারা ঘুষ প্রদান করেছেন, তাদের নথি দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়েছে এবং তারা সময়মতো সম্পূর্ণ অর্থ পেয়েছেন। অন্যদিকে, যারা ঘুষ দেননি, তাদের ক্ষেত্রে অযথা বিলম্ব, হয়রানি এবং অর্থ কম প্রদান করা হয়েছে।
এই অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে কেটে রাখা অর্থ দ্রুত ফেরত প্রদান এবং স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীরা মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের মতো জাতীয় মর্যাদাপূর্ণ বিষয় সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অনিয়ম অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। তারা আশা প্রকাশ করেন, সরকার দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষিত করবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেবে।