ঢাকা, শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৩:১৯:১৮ PM

পাসপোর্ট অধিদপ্তরে এক গ্রাম থেকে ১১২ জন নিয়োগ

স্টাফ রিপোটার ।। করাপশনমিরর.কম
26-06-2026 09:13:51 AM
পাসপোর্ট অধিদপ্তরে এক গ্রাম থেকে ১১২ জন নিয়োগ

পাসপোর্ট অধিদপ্তরে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ১৮৫ জন জনবল নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, কোনো ধরনের প্রকাশ্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা কিংবা মৌখিক যাচাই ছাড়াই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ছয়টি ক্যাটাগরিতে মোট ১৮৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পদগুলো ছিল—পরিচ্ছন্নতাকর্মী ১০৪ জন, ডেসপ্যাচ রাইডার বা মেসেঞ্জার ৫৯ জন, লিফটম্যান ১০ জন, গার্ডেনার (মালি) ৬ জন, পাম্প অপারেটর ৪ জন এবং ইলেকট্রিশিয়ান ২ জন। এসব পদে মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ইলেকট্রিশিয়ানদের বেতন ধরা হয়েছে ২০ হাজার ২১২ টাকা, পাম্প অপারেটরদের ১৯ হাজার ৬৩৬ টাকা, গার্ডেনারদের ১৮ হাজার ৬৬০ টাকা এবং অন্যান্য পদে ১৮ হাজার ১৮৯ টাকা করে।

একটি আউটসোর্সিং কোম্পানিকে ঘিরে চুক্তির অভিযোগ

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, “যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিসেস লিমিটেড” নামের একটি আউটসোর্সিং কোম্পানির সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের ভিত্তিতে গোপন চুক্তির মাধ্যমে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। কিছু ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্যের ভিত্তিতে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ার সমন্বয় করেছেন পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সালাউদ্দিন এবং উপপরিচালক তারিক সালমান। তাদের তত্ত্বাবধানে পুরো প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেন পরিচালক শিহাব উদ্দিন—এমনটিই দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

এক গ্রাম থেকে বিপুল সংখ্যক নিয়োগ

সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল উপজেলার আকবপুর গ্রাম থেকে ১১২ জনের নিয়োগ পাওয়া। জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করে এই তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, এই ১১২ জনের মধ্যে অন্তত ৮৮ জন পূর্বেও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, এমএলএসএস, নৈশপ্রহরী ও ডেসপ্যাচ রাইডার পদে কর্মরত ছিলেন। পূর্ববর্তী চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক মাস পর আবারও একই ব্যক্তি বা তাদের পুনর্নিয়োগ পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এছাড়া বলা হয়, একই গ্রাম থেকে আগের সরকারের সময়েও বিপুল সংখ্যক জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তখন প্রায় ২৫০ জন কর্মীর মধ্যে ১৫০ জনই আকবপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন বলে দাবি করা হয়।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংযোগের অভিযোগ

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার পেছনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক পর্যায়ের কিছু ব্যক্তির সুপারিশ ও প্রভাব থাকতে পারে বলে অভিযোগ রয়েছে।

একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের মাধ্যমে একটি বড় সংখ্যক জনবল সরবরাহ করা হয়েছে—এমন দাবিও করা হয়। পাশাপাশি পাসপোর্ট অধিদপ্তরের তৎকালীন ও সাবেক কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সুপারিশে বিভিন্ন নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে বলে তালিকা আকারে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

আউটসোর্সিং চুক্তি ও কর্মী ব্যবস্থাপনা

চুক্তি অনুযায়ী পূর্ববর্তী আউটসোর্সিং কোম্পানির মেয়াদ শেষ হয় গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে। এরপর কিছু সময় চুক্তি নবায়ন করা হলেও পরে তা আর নবায়ন হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগে বলা হয়, চুক্তি শেষ হওয়ার পরও কিছু কর্মী আগের কর্মস্থলে থেকে যান এবং সরকারি তহবিল থেকে বেতন না পেয়ে বিকল্পভাবে অবৈধ সুবিধা গ্রহণ বা ফাইল অনুমোদনের সুযোগ পেয়েছেন—এমন দাবি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা হয়নি।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষার অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো—এই ১৮৫ জন নিয়োগে কোনো প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি, লিখিত পরীক্ষা বা মৌখিক পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরাসরি সুপারিশ এবং আউটসোর্সিং কোম্পানির মাধ্যমে জনবল সরবরাহই ছিল মূল পদ্ধতি।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অবস্থান

অভিযোগের বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আউটসোর্সিং পদ্ধতি সরকার অনুমোদিত বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং সরকার নির্ধারিত নিবন্ধিত কোম্পানির মাধ্যমেই জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অধিদপ্তরের বক্তব্যে আরও বলা হয়, নির্দিষ্ট একটি গ্রামের ১১২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য সঠিক নয়। এছাড়া কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তার সুপারিশে নিয়োগ হয়েছে—এমন তথ্যও তাদের কাছে নেই বলে জানানো হয়।

স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিক্রিয়া

স্থানীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট একজন জনপ্রতিনিধি দাবি করেছেন, তার এলাকার অনেক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অধিদপ্তরের আউটসোর্সিং কাজে যুক্ত ছিলেন এবং যোগ্যতার ভিত্তিতেই তারা পুনরায় কাজ পেয়েছেন। তিনি আরও দাবি করেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কারও কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।

সার্বিক পরিস্থিতি

সব মিলিয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এই আউটসোর্সিং নিয়োগকে ঘিরে স্বচ্ছতা, নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিয়মনীতি, এবং প্রশাসনিক প্রভাবের প্রশ্ন উঠেছে। এক গ্রামের বড় সংখ্যক নিয়োগ এবং পূর্ববর্তী কর্মীদের পুনর্নিয়োগ বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া সরকার অনুমোদিত আউটসোর্সিং কাঠামোর মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে।

এই ঘটনাকে ঘিরে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই ও তদন্ত করা হলে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে মত রয়েছে।