ঢাকা, শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৪:৪৪:৪৫ PM

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজিকে ঘিরে বিতর্ক

স্টাফ রিপোটার ।। করাপশনমিরর.কম
26-06-2026 09:26:11 AM
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজিকে ঘিরে বিতর্ক

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নবনিযুক্ত মহাপরিচালক মুহিববুল্লাহিল বাকীকে ঘিরে বিভিন্ন সময় একাধিক গুরুতর অভিযোগ ও বিতর্ক প্রকাশ পেয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। এশিয়া পোস্টে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানা যায়, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশাসনিক আচরণ, দাপ্তরিক নথি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলোই তদন্তাধীন বা বিতর্কিত দাবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তা অস্বীকার করেছেন।

শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অভিযোগ

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মুহিববুল্লাহিল বাকীর শিক্ষাজীবনের সময়সূচি ও বয়স নিয়ে অসঙ্গতি রয়েছে। সেখানে বলা হয়, তিনি ১৩ বছর বয়সে দাখিল পাস এবং ১৪ বছর বয়সে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেছেন বলে বিভিন্ন নথিতে উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া একই সময়ে একাধিক দেশে বা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার দাবি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, তার দাখিল, আলিম, ফাজিল এবং দাওরার সনদ ও শিক্ষাবর্ষ সংক্রান্ত নথিতে কিছু পরস্পরবিরোধী তথ্য রয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষাবর্ষের ভিন্নতা এবং মার্কশিট ও সাময়িক সনদের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকার বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও সনদ সংক্রান্ত বিষয়

প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, ২০১৫ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি তার দাখিলকৃত কিছু সনদ ও নথি পরীক্ষা করে। সেখানে হাটহাজারী মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট কিছু শিক্ষককে উদ্ধৃত করে বলা হয়, প্রদর্শিত সনদের ডিজাইন, মনোগ্রাম ও কাঠামো মূল সনদের সঙ্গে মিল ছিল না।

তদন্ত প্রতিবেদনের বরাতে আরও দাবি করা হয় যে, কিছু মার্কশিট একত্রে ইস্যু করার বিষয়টি প্রচলিত নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। তদন্ত কমিটি এসব নথিকে প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রশাসনিক শাস্তি ও বদলি সংক্রান্ত অভিযোগ

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সালে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ, কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য এবং অনুপস্থিতির অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরে বিভিন্ন আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার চাকরি পুনর্বহাল হয় বলে উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া বদলি সংক্রান্ত একটি আদেশ অমান্য করার অভিযোগ এবং পরবর্তীতে হাইকোর্টে রিট দায়েরের বিষয়টিও প্রতিবেদনে এসেছে। পরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বরখাস্ত প্রত্যাহার করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।

হালাল সনদ প্রদান ও আর্থিক সুবিধার অভিযোগ

প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে যে, তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দায়িত্বে থাকাকালীন অনুমোদন ছাড়া একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে হালাল সনদ প্রদান করেছেন। এতে সরকারি রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়।

এছাড়া হালাল সনদ সংক্রান্ত দায়িত্ব সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একক এখতিয়ার হলেও ব্যক্তিগতভাবে এই সনদ প্রদান করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

আদালত ও রিট মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগ

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একটি সিনিয়র ইমামের পদোন্নতি সংক্রান্ত নথি জাল করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছিল বলে তদন্তে অভিযোগ ওঠে। তদন্ত কমিটি কিছু সংযুক্ত নথিকে “অপ্রামাণিক” বা “দাপ্তরিক অস্তিত্ববিহীন” হিসেবে চিহ্নিত করে বলে দাবি করা হয়।

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন যে, মূল পদোন্নতি আদেশ বৈধ হলে জালিয়াতির প্রশ্ন আসে না।

পরিচয় ব্যবহার ও অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ড ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সদস্য হিসেবে যুক্ত থেকে আর্থিক বা সম্মানী সুবিধা গ্রহণের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

সরকারি হজ মিশনে নিয়মিতভাবে অংশগ্রহণ নিয়েও কিছু কর্মকর্তা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য

অভিযোগগুলোর বিষয়ে মুহিববুল্লাহিল বাকী বলেন, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বয়স সংক্রান্ত হিসাব ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তার মতে, বয়স গণনায় মাস ও বছরের হিসাব সঠিকভাবে বিবেচনা করা হয়নি।

তিনি আরও দাবি করেন, দাওরায়ে হাদিস ও হিফজ সনদ বিষয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যা ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তার মতে, কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় একই কাঠামোতে প্রচলিত সনদের নিয়ম আলাদা ছিল এবং সরকারি স্বীকৃতি না থাকায় একাধিক ধারায় শিক্ষা গ্রহণ সম্ভব ছিল।

হালাল সনদ প্রদান সংক্রান্ত অভিযোগ তিনি অস্বীকার করে বলেন, এটি কোনো অবৈধ কাজ নয় এবং তখন সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর থেকে দায়িত্বপূর্ণভাবে কাজ করা হতো না বলে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন বলে দাবি করেন।

রিট মামলা ও নথি জালিয়াতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেসব নথিকে জাল বলা হচ্ছে তা প্রকৃতপক্ষে বৈধ এবং প্রশাসনিক ভুল বোঝাবুঝির কারণে এসব অভিযোগ উঠেছে।

বিভিন্ন পদ ও সুবিধা গ্রহণের অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, এসব পদ সাধারণত সম্মানসূচক এবং আর্থিকভাবে লাভজনক নয়। তার ভাষায়, এসব বিষয়ে অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে।

সামগ্রিক মূল্যায়ন

এশিয়া পোস্টে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশাসনিক আচরণ, দাপ্তরিক নথির সত্যতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা অন্তর্ভুক্ত।

অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও ভুল ব্যাখ্যা বলে দাবি করেছেন এবং প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ায় তার অবস্থানকে বৈধ বলে উল্লেখ করেছেন।

বর্তমানে এসব অভিযোগের অনেকগুলোই বিতর্কিত এবং কিছু ক্ষেত্রে অতীতের তদন্ত প্রতিবেদন ও প্রশাসনিক নথির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আইনগত রায় না আসা পর্যন্ত এটিকে অভিযোগ ও পাল্টা ব্যাখ্যার একটি চলমান পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।