ঢাকা, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৭:৩০:২৪ PM

কায়ছার আলীকে খোঁজছেন খাদ্য কর্মকর্তারা

স্টাফ রিপোটার ।। করাপশনমিরর.কম
29-06-2026 12:16:12 PM
কায়ছার আলীকে খোঁজছেন খাদ্য কর্মকর্তারা

চট্টগ্রামের সাবেক আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (আরসি ফুড) এবং বর্তমানে রাজশাহীর আরসি ফুড হিসেবে কর্মরত এস. এম. কায়ছার আলীর বিরুদ্ধে ব্যাপক বদলি বাণিজ্য ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, চলতি বছরের মার্চ মাসের শেষ দিকে চট্টগ্রাম থেকে বদলির প্রাক্কালে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ১৪ জন খাদ্য কর্মকর্তাকে নতুন পদায়ন ও বদলির আদেশ দিয়ে তিনি প্রায় দুই কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ করেন। পরে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে এসব আদেশ বাতিল হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ আর ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ এস. এম. কায়ছার আলীকে চট্টগ্রাম থেকে খুলনার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদে বদলি করা হয়। তবে তিনি খুলনায় যোগদান এড়াতে বিভিন্ন মহলে তদবির চালান। শেষ পর্যন্ত বদলি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে ২৮ থেকে ৩০ মার্চের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে ১৪টি স্মারকে ১৪ জন কর্মকর্তাকে ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) পদে পদায়নের আদেশ জারি করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রতিটি পদায়নের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম ঘুষ নেওয়া হয়। পদায়নের গুরুত্ব অনুযায়ী এই অর্থ নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এভাবে তিন দিনের মধ্যেই প্রায় দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

তবে বিষয়টি দ্রুত খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নজরে আসে। অভিযোগ ওঠে, নিজের বদলির আদেশ কার্যকর হওয়ার পর অধীনস্থ কর্মকর্তাদের বদলি বা পদায়নের আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার তার ছিল না। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের এসব পদায়নের বিষয়ে তখনও মন্ত্রণালয় কিংবা খাদ্য অধিদপ্তরের অনুমোদনও পাওয়া যায়নি। এসব অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন সচিব অবিলম্বে সব আদেশ বাতিলের নির্দেশ দেন। পরে ৩০ মার্চ এস. এম. কায়ছার আলী নিজেই ২৮, ২৯ ও ৩০ মার্চ জারি করা সব পদায়নের আদেশ বাতিল করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেন।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, পদায়নের আদেশ বাতিল হলেও কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নেওয়া ঘুষের অর্থ ফেরত দেওয়া হয়নি। বর্তমানে রাজশাহীতে পদায়নের পর চট্টগ্রামের কয়েকজন কর্মকর্তা বিভিন্ন মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা ফেরত চাইছেন। তবে ঘুষ লেনদেনের বিষয় হওয়ায় তারা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। তাদের আশঙ্কা, প্রভাবশালী এই কর্মকর্তা ভবিষ্যতে প্রশাসনিকভাবে ক্ষতির কারণ হতে পারেন।

এস. এম. কায়ছার আলীর বিরুদ্ধে অতীতেও অনিয়ম ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং বদলি-পদায়ন নীতিমালার সীমা অতিক্রম করে প্রায় পাঁচ বছর কুমিল্লার জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের পদেও তার পদায়ন হয়, যা নিয়োগনীতির ব্যতিক্রম বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

এছাড়া গত বছরও তাকে খুলনায় বদলি করা হলেও এক দিনের মধ্যে সেই আদেশ বাতিল হয়। সংশ্লিষ্ট মহলে তখনও প্রভাব ও অর্থের বিনিময়ে বদলি বাতিলের আলোচনা ছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

সর্বশেষ খুলনায় যোগদানের মাত্র দুই মাসের মাথায় রাজশাহীর আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদে তার নতুন পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, গত ১৪ মে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে ওই পদে অতিরিক্ত পরিচালক ইকবাল বাহার চৌধুরীকে পদায়ন করা হয়েছিল। কিন্তু পরে নতুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ২ জুন এস. এম. কায়ছার আলীকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়েও বিভিন্ন মহলে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো সরকারি তদন্ত বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়নি।

এদিকে খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক জহিরুল ইসলাম খানকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত অনিয়ম সংক্রান্ত অভিযোগ এবং আদালতে দায়ের করা একাধিক মামলার প্রেক্ষাপটে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, জহিরুল ইসলাম একই সময়ে নিজের স্ত্রী ও স্ত্রীর ভাগ্নীকে বিয়ে করেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর পারিবারিক বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। তার স্ত্রী শারমিন আক্তার নির্যাতন ও অন্যান্য অভিযোগে একাধিক মামলা দায়ের করেন। এর মধ্যে তিনটি মামলায় চার্জশিট দাখিল হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এ ঘটনায় খাদ্য মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর জহিরুল ইসলাম খানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

এসব অভিযোগের বিষয়ে এস. এম. কায়ছার আলী ও জহিরুল ইসলাম খানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।