ঢাকা, রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬,
সময়: ০৫:১০:৩৫ PM

তিস্তা প্রকল্পে বাংলাদেশের পাশে চীন,পর্যবেক্ষণে ভারত

স্টাফ রিপোটার।। করাপশনমিরর.কম
30-06-2026 07:18:09 AM
তিস্তা প্রকল্পে বাংলাদেশের পাশে চীন,পর্যবেক্ষণে ভারত

বাংলাদেশের তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়ে আবারও প্রকাশ্যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। বেইজিং জানিয়েছে, বাংলাদেশের জনগণের জীবন-জীবিকা ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে তারা প্রস্তুত। একই সঙ্গে চীন স্পষ্ট করে বলেছে, তাদের এই সহযোগিতার প্রস্তাব কোনো তৃতীয় দেশকে লক্ষ্য করে নয় এবং বিষয়টিকে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৃষ্টিতে না দেখার আহ্বান জানিয়েছে।

বেইজিংয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, তিস্তা নদীর উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান, কৃষি উৎপাদন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তাই এ প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করতে আগ্রহী। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা, উন্নয়ন এবং অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে অর্থনীতি, বাণিজ্য, অবকাঠামো, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জনকল্যাণসহ বিভিন্ন খাতে দুই দেশের সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

চীনের এই বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন তিস্তা প্রকল্পকে ঘিরে ভারতের কৌশলগত মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা অববাহিকার ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রকল্প এলাকা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডরের তুলনামূলক কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে এ অঞ্চলে যেকোনো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প স্বাভাবিকভাবেই ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিশ্লেষণের অংশ হয়ে ওঠে।

ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বিষয়টি শুধু নদী উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রকল্পের অবস্থান, সম্ভাব্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সেখানে চীনের সম্পৃক্ততার সম্ভাবনাও ভারতের পর্যবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তবে এ বিষয়ে ভারত সরকার এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। ফলে দিল্লির অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব না হলেও বিষয়টি যে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, তা বিশ্লেষকদের আলোচনায় উঠে এসেছে।

এর আগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় তিস্তা প্রকল্পে ভারতের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে সেই উদ্যোগ বাস্তব রূপ পায়নি। পরবর্তীতে বর্তমান সরকার প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের সহযোগিতা গ্রহণের উদ্যোগ জোরদার করলে বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম আরও এগিয়ে যায়। এরপর থেকেই তিস্তা প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের সম্পর্ক এবং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন সমীকরণের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

বিশ্লেষকদের মতে, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা গ্রহণের পূর্ণ অধিকার রাখে। উন্নয়ন প্রকল্পে কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা হবে, তা বাংলাদেশের নিজস্ব নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। একই সময়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় বড় ধরনের অবকাঠামো প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করাও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক বাস্তবতা।

পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, তৃতীয় কোনো দেশকে লক্ষ্য করে নয়—চীনের এমন বক্তব্য মূলত আঞ্চলিক উদ্বেগ কমানোর একটি কূটনৈতিক বার্তা। বেইজিং চাইছে, তিস্তা প্রকল্পকে উন্নয়ন সহযোগিতার অংশ হিসেবে দেখা হোক, প্রতিযোগিতামূলক ভূরাজনীতির অংশ হিসেবে নয়। তবে বাস্তবতা হলো, দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে যেকোনো বড় উন্নয়ন প্রকল্পই কৌশলগত গুরুত্ব লাভ করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচব্যবস্থা, নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ, বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে তিস্তা প্রকল্প এখন আর শুধু একটি নদী উন্নয়ন কর্মসূচি নয়; এটি বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের পারস্পরিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রকল্পটির অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধরন এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক অবস্থান আগামী দিনেও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহলের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকবে।