রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে, প্রশাসনে এসেছে বড় রদবদল, চলছে দুর্নীতিবিরোধী নানা তৎপরতা। কিন্তু জাদুর কাঠির মতোই অক্ষত রয়েছে স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বিতর্কিত ঠিকাদার জাহের উদ্দিন সরকারের ‘সিন্ডিকেট’। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই জাহেরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক মামলা ও ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ থাকলেও, তার গড়ে তোলা ঠিকাদারি নেটওয়ার্ক এখনো নেপথ্যে সক্রিয় বলে অভিযোগ উঠেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও স্বাস্থ্য খাতের সূত্রগুলো বলছে, জাহেরের প্রভাব এতটাই প্রবল ছিল যে, তার পছন্দের চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ের চাহিদাপত্রে (রেকুইজিশন) সই না করলে সরকারি হাসপাতালের পরিচালকদের তাৎক্ষণিক বদলি করা হতো।
চাহিদাপত্রে সই না করলেই বদলির ‘করাত’
স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন জাহের উদ্দিন সরকার। অভিযোগ রয়েছে, কোনো হাসপাতালের প্রধান বা তত্ত্বাবধায়ক যদি তার সরবরাহ করা নিম্নমানের বা অতিরিক্ত মূল্যের যন্ত্রপাতির চাহিদাপত্রে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানাতেন, তবেই নেমে আসত প্রশাসনিক খড়্গ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান,
"জাহেরের সিন্ডিকেটের কথামতো কাজ না করলেই কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক চাপ ও বদলির হুমকি দেওয়া হতো। অনেক ক্ষেত্রে সৎ কর্মকর্তাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলিও করা হয়েছে। ফলে অনেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়াই কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ক্রয়ের অনুমোদন দিতে বাধ্য হতেন।"
শিক্ষকতা থেকে ঠিকাদারি সাম্রাজ্য: ‘সবাই ঠিকাদার’
অনুসন্ধানে জানা যায়, জাহের উদ্দিন সরকারের উত্থান রূপকথার মতো। তার গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর বেতদীঘি ইউনিয়নের হরগোবিন্দপুর গ্রামে। বাবা আবদুস সাত্তার সরকার। জাহের একসময় স্থানীয় বেতদীঘি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতা ছেড়ে ঢাকায় এসে প্রথমে এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। এরপর জাদুর মতো বদলাতে থাকে তার ভাগ্য। গড়ে তোলেন নিজস্ব ঠিকাদারি সাম্রাজ্য।
শুধু জাহের একাই নন, তার পুরো পরিবারই এখন স্বাস্থ্য খাতের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের এই পারিবারিক সিন্ডিকেটের মধ্যে বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোং নামের প্রতিষ্ঠানটির মালিক জায়ের নিজেই। ছেলে আহসান হাবিব সরকারের নামে মার্কেন্টাইল ট্রেড কর্পোরেশন, ভগ্নিপতি আসাদুর রহমানের নামে রয়েছে ইউনিভার্সেল ট্রেড কর্পোরেশন। বাবা আব্দুস সাত্তার সরকারের নামে রয়েছে মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামের প্রতিষ্ঠান।
এর বাইরে জাহেরের শ্বশুরসহ আরও কয়েকজন নিকটাত্মীয়ের নামে বেনামে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মূল নিয়ন্ত্রক জাহের নিজেই।
১ বছরেই ৫ মামলা, তবুও বহাল তবিয়তে!
দুদকের উপ-পরিচালক মো. শামসুল আলমের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি অনুসন্ধান করতে গিয়ে এই পারিবারিক সিন্ডিকেটের ভয়ংকর জালিয়াতি সামনে আসে। হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র ক্রয়ের নামে শত শত কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে কেবল ২০১৯ সালেই এই পরিবারের বিরুদ্ধে “৫টি মামলা”করে দুদক।
দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পরপরই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আলোচিত ও বরখাস্ত হওয়া হিসাবরক্ষক আবজালের সহযোগিতায় দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান জাহের। পরিস্থিতি শান্ত হলে তিনি আবার দেশে ফিরে আসেন। এরপর দুর্নীতি ঢাকতে একটি দৈনিক পত্রিকার মালিক বনে যান তিনি। বর্তমানে বেশ কিছু সিনিয়র সাংবাদিক নিয়ে তিনি একটি সিন্ডিকেট তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও সূত্র নিশ্চিত করেছে।
দুদকের অনুসন্ধান দলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
"ঠিকাদারির নামে জালিয়াতি করে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন জাহের। জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পাচার করেছেন বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। জাহের ও তার পরিবারের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের পৃথক অনুসন্ধান চলছে। ইতিমধ্যে তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া চলছে।"
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও দুদকের বক্তব্য
ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের কারণে স্বাস্থ্য খাতের এই বেহাল দশায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, হাসপাতালের প্রয়োজন নির্ধারণ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ চিকিৎসা প্রশাসনের বিষয়। সেখানে একজন সরবরাহকারী বা ঠিকাদারের এমন নগ্ন প্রভাব জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। তারা এই চক্রের নেপথ্যের নায়কদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন,
"স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে কমিশন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইতিমধ্যে একাধিক ঠিকাদারের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। যারা আত্মগোপনে আছেন বা সম্পদের বিবরণী জমা দেননি, তাদের সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার জন্য অনুসন্ধান কর্মকর্তারা কাজ করছেন। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।"
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এই সিন্ডিকেটের অদৃশ্য সুতা কারা নাড়াচ্ছে এবং জাহেরের আসল খুঁটির জোর কোথায়—তা বের করাই এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।