ঢাকা, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৬:০৯:২৮ AM

মালামাল ছাড়াই ৯২ কোটি টাকা বিল পরিশোধ

স্টাফ রিপোটার।। করাপশনমিরর.কম
31-07-2026 02:13:58 PM
মালামাল ছাড়াই ৯২ কোটি টাকা বিল পরিশোধ

চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে কোনো মালামাল সরবরাহ না করেই ‘ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন (ইডিসি)’ প্রকল্পে ৯২ কোটি ২৬ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। রাউটার ক্রয়ে অতিরিক্ত ব্যয়, আসবাবপত্র কেনা, পরামর্শক নিয়োগ এবং আউটসোর্সিংসহ বিভিন্ন খাতে অনিয়মের কারণে প্রকল্পটিতে ১৫৫ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপটিক্যাল ফাইবার কেবল ক্রয়সংক্রান্ত অনিয়ম প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা। যথাযথ নথিপত্র যাচাই না করেই বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড় দেওয়াকে আর্থিক শৃঙ্খলার গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে আইএমইডি।

দেশের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত উচ্চগতির ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ৫ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ইডিসি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ২০২১ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২৫ সালের নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজের ধীরগতির কারণে মেয়াদ ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবে চার বছর অতিক্রম করেও প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১৮ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশ।

প্রকল্পের ধীরগতির কারণে দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাবে মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় ৫ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ২ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ চার বছরের প্রকল্প শেষ করতে সময় লাগবে প্রায় আট বছর।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা, আর্থিক শৃঙ্খলার অভাব এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায়। অবশিষ্ট কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক সংস্কার, কার্যকর তদারকি এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

রাউটার ক্রয়ে বড় ধরনের অনিয়মের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই ধরনের রাউটার ভিন্ন ভিন্ন প্যাকেজে ভিন্ন দামে কেনা হয়েছে, যার ফলে সরকারের প্রায় ২৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আইএমইডির মতে, বাজারদরের তুলনায় বেশি দামে রাউটার কেনা হয়েছে এবং পুরো ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ছিল।

এ ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) বরাদ্দ না থাকলেও অফিস সংস্কারের নামে ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকার চুক্তি করে আসবাবপত্র কেনা হয়েছে। সরকারি নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি ভাড়া দিয়ে অফিস পরিচালনার ফলে আরও ১৮ লাখ ১৭ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্যাচ কর্ড ক্রয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ দেখিয়ে ৭ কোটি ২৯ লাখ টাকার অনিয়মিত চুক্তি এবং আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ ছাড়াই ১২ কোটি ২২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা পরিশোধের অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে আরও ১১ কোটি ৬৭ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করা হয়েছে। পাশাপাশি ত্রৈমাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা না দিয়েই স্থানীয় পরামর্শকদের ৩ কোটি ৮ লাখ টাকা এবং সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর-২০০৮) লঙ্ঘন করে ব্যক্তিগত পরামর্শক নিয়োগে ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। আইএমইডি মনে করছে, অভ্যন্তরীণ অডিট ব্যবস্থা অকার্যকর থাকা এবং পিপিআর যথাযথভাবে অনুসরণ না করাই এসব অনিয়মের মূল কারণ।

মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রও উদ্বেগজনক। কাগজে-কলমে প্রায় ৫৫ হাজার প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার দাবি করা হলেও আইএমইডির জরিপে দেখা গেছে, সংযোগপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের ৫০ দশমিক ৫২ শতাংশ ব্যবহারকারী নিয়মিত সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার অভিযোগ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে সংযোগ দেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যেই তা অকেজো হয়ে পড়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জামের মান সন্তোষজনক নয়। অনেক স্থানে সরঞ্জাম স্থাপনের এক মাসের মধ্যেই কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে। অভিযোগ জানানো হলেও সংশ্লিষ্ট ভেন্ডর বা ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (আইএসপি) সময়মতো টেকনিশিয়ান পাঠায়নি। ফলে মূল্যবান সরকারি সরঞ্জাম দীর্ঘদিন অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবও প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জরিপে ৪২ দশমিক ০৬ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ডিজিটাল সেবা ব্যাহত হচ্ছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে ইউপিএস বা কার্যকর বিদ্যুৎ ব্যাকআপ ব্যবস্থা নেই। অন্যদিকে চুক্তি অনুযায়ী ২০ এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক স্থানে ইন্টারনেটের গতি শূন্য এমবিপিএস পর্যন্ত নেমে আসে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়েছে। গত চার বছরে তিনবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা হয়েছে। অনুমোদিত ৬৪৪টি পদের মধ্যে ৬১টি গুরুত্বপূর্ণ পদ এখনো শূন্য রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত ৭১টি সরকারি পদের বিপরীতে নিয়োগ পেয়েছেন মাত্র সাতজন। ফলে তদারকি, কারিগরি সহায়তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে আইএমইডি একাধিক সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যান্ডউইথ বৃদ্ধি, বিকল্প নেটওয়ার্ক ও রিডান্ডেন্সি ব্যবস্থা চালু, উপজেলা আইসিটি কেন্দ্রগুলোর কার্যকর ব্যবহার, বাস্তবভিত্তিক ক্রয় পরিকল্পনা, কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক মনিটরিং ব্যবস্থা স্থাপন, প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার এবং সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করা।

তবে প্রকল্প পরিচালক তানজিনা ইসলাম আইএমইডির কয়েকটি পর্যবেক্ষণের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, নিরীক্ষা কার্যক্রমে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে মাত্র দুটি জেলার ছয়টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হয়েছে। চার কোরের পরিবর্তে দুই কোর অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহারের কারণে যে অডিট আপত্তি উঠেছিল, সংশ্লিষ্ট স্থানে ইতোমধ্যে চার কোর ফাইবার প্রতিস্থাপন করা হয়েছে এবং আপত্তি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলছে।

রাউটারের দামের পার্থক্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উন্মুক্ত দরপত্রে প্রায় ১৫০টি আইএসপি অংশগ্রহণ করেছিল এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব দর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে সব মিলিয়ে ব্যয় সরকারি প্রাক্কলিত সীমার মধ্যেই ছিল, ফলে সরকারের কোনো আর্থিক ক্ষতি হয়নি।

এছাড়া আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগে যথাযথ দায়িত্ব নির্ধারণ করেই দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহক প্রতিষ্ঠান সময়মতো ব্যান্ডউইথের বিল পরিশোধ না করায় সেবা ব্যাহত হয়েছে। সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি জানান, এক বছরের ওয়ারেন্টি চলাকালে নষ্ট হওয়া যন্ত্রপাতি সংশ্লিষ্ট আইএসপি প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করেছে এবং ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।