ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০২:২৭:৫০ PM

গ্রুপিংয়ের রাজনীতিতে খোকা-আব্বাস

স্টাফ রিপোটার।। করাপশন মিরর.কম
06-10-2026 01:00:00 PM
গ্রুপিংয়ের রাজনীতিতে খোকা-আব্বাস

রাজনীতিতে মতপার্থক্য, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা কিংবা গ্রুপিং নতুন কোনো বিষয় নয়। বরং একটি বড় রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মত ও নেতৃত্বের বলয় থাকা অনেক সময় সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতেও ভূমিকা রাখে। তবে সেই প্রতিযোগিতা যখন ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, কাদা ছোড়াছুড়ি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরস্পরকে আক্রমণ কিংবা সংঘাতে রূপ নেয়, তখন তা দলের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে ঢাকার রাজনীতিতে সাদেক হোসেন খোকা ও মির্জা আব্বাসের রাজনৈতিক সম্পর্ককে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যায়।

২০০০ সালের শুরুর দিকের ঢাকার রাজনীতিতে এই দুই নেতার নিজস্ব প্রভাব ও শক্তিশালী অনুসারী বলয় ছিল। একদিকে ছিলেন ঢাকার সাবেক মেয়র ও বিএনপির প্রভাবশালী নেতা সাদেক হোসেন খোকা, অন্যদিকে ছিলেন দলের আরেক প্রভাবশালী নেতা মির্জা আব্বাস। দুজনের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও গ্রুপিং ছিল স্পষ্ট। কে কতটা প্রভাবশালী, কার সাংগঠনিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী—এসব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা থাকত। কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও রাজনৈতিক সৌজন্য বজায় রাখার একটি সংস্কৃতি ছিল বলে তাদের সমসাময়িকদের অনেকেই উল্লেখ করেন।

ঢাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচিতে দুজনের অনুসারীদের মধ্যে স্লোগান কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রতিযোগিতা দেখা যেত। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা সবসময় ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত হতো না। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করলেও দিন শেষে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সৌজন্য বজায় রাখার চেষ্টা ছিল। কর্মীদের মধ্যেও নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য ছিল স্পষ্ট। কেউ নিজেকে খোকা ভাইয়ের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেন, কেউ ছিলেন আব্বাস ভাইয়ের অনুসারী। এই পৃথক রাজনৈতিক বলয় দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকে দুর্বল করার বদলে অনেক ক্ষেত্রে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয়তা বাড়িয়েছিল।

তাদের রাজনৈতিক সম্পর্কের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল পারস্পরিক স্বীকৃতি। মির্জা আব্বাস যখন ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্বে আসেন, তখন সাদেক হোসেন খোকা তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন—এমন ঘটনা তাদের রাজনৈতিক সৌজন্যের উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়। একইভাবে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে তারা একে অপরের প্রতি যে সম্মান দেখাতেন, সেটি তাদের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে অনেকের কাছে স্মরণীয়।

সাদেক হোসেন খোকার জীবনের শেষ অধ্যায়েও তাদের সম্পর্কের মানবিক দিকটি বিশেষভাবে সামনে আসে। নিউইয়র্কে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খোকার শারীরিক অবস্থার অবনতির খবর প্রকাশিত হলে মির্জা আব্বাসের আবেগঘন প্রতিক্রিয়া ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও সহকর্মী ও বন্ধুর প্রতি তার আবেগ প্রকাশ করে দেওয়া সেই বার্তা দেখিয়েছিল—রাজনীতির প্রতিযোগিতা ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও মানবিকতাকে সবসময় মুছে দেয় না।

বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক নেতাকর্মীর মতপ্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে অনেক সময় রাজনৈতিক মতবিরোধ সেখানে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটূক্তি কিংবা পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদগারে পরিণত হয়। পদ-পদবি, নেতৃত্ব কিংবা সাংগঠনিক প্রভাব নিয়ে বিরোধ কখনো কখনো সংঘাত ও সহিংসতারও জন্ম দেয়। এর ফলে দলের সাংগঠনিক শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সাধারণ মানুষের কাছেও রাজনীতির নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়।

খোকা ও আব্বাসের রাজনৈতিক অধ্যায় তাই শুধু গ্রুপিংয়ের উদাহরণ নয়; এটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে সৌজন্য, পারস্পরিক সম্মান ও ব্যক্তিত্ববোধ কীভাবে সহাবস্থান করতে পারে, তারও একটি স্মরণীয় দৃষ্টান্ত। নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকবে, মতপার্থক্য থাকবে, ক্ষমতার হিসাবও থাকবে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতাকে ব্যক্তিগত বিদ্বেষে পরিণত না করে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখাই একজন প্রকৃত নেতার পরিচয়।

রাজনীতিতে বড় নেতা হতে হলে শুধু অনুসারী কিংবা পদ-পদবি থাকলেই হয় না; প্রয়োজন উদারতা, আত্মসংযম, প্রতিপক্ষকে সম্মান করার মানসিকতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি। সাদেক হোসেন খোকা ও মির্জা আব্বাসের রাজনৈতিক সম্পর্ক সেই শিক্ষাই স্মরণ করিয়ে দেয়—গ্রুপিং থাকতে পারে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতে পারে, কিন্তু নেতৃত্বের মর্যাদা রক্ষায় শিষ্টাচার ও মানবিকতা কখনো বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়।