ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০২:২৮:১৮ PM

শিক্ষক:সমাজ পরিবর্তননের আলোকবর্তিকা

আফসানা আরেফিন
06-10-2026 12:03:00 PM
শিক্ষক:সমাজ পরিবর্তননের আলোকবর্তিকা

সমাজ ও সভ্যতার বিবর্তনের ইতিহাসে শিক্ষকের ভূমিকা কেবল তথ্য বিনিময়ে সীমাবদ্ধ নয়, শিক্ষক হলেন মানবাত্মার রূপকার, সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী এবং আগামীর রূপকল্প নির্মাণকারী একজন নীরব কারিগর। বলা হয়ে থাকে একটি জাতির মেরুদণ্ড যদি হয় শিক্ষা তবে সেই শিক্ষার আত্মাতুল্য হলেন শিক্ষক। যুগে যুগে শিক্ষকরাই সমাজের অন্ধকারের বিরুদ্ধে জ্বালিয়েছেন জ্ঞানের আলো, ভাঙার চেষ্টা করেছেন কুসংস্কারের প্রাচীর এবং নতুন প্রজন্মকে দেখিয়েছেন ন্যায়ের পথ। বিশ্ব শিক্ষক দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে তাই সমাজ পরিবর্তনের অদম্য শক্তি হিসেবে শিক্ষক ও তাঁদের অমূল্য অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা আবশ্যক।
​
​সমাজ একটি গতিশীল সত্তা আর এই গতিশীলতাকে ইতিবাচক ধারায় পরিচালিত করার মূল অনুঘটক হলেন শিক্ষকবৃন্দ। শ্রেণিকক্ষের চারদেয়ালের মাঝে শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের সিলেবাস শেষ করেন না তিনি শিক্ষার্থীদের মনন ও আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেন। শিক্ষকের কাছ থেকেই একটি শিশু বা তরুণ শেখে  সততা, মানবিকতা, ধৈর্য, সহনশীলতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ। নৈতিকতাহীন শিক্ষা সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর ভেতর ন্যায়-অন্যায়ের বোধ ও চরিত্র গঠন করেন। তিনি শেখান কীভাবে অহংকার ও অন্ধবিশ্বাস ত্যাগ করে সততা ও মানবিকতার চর্চা করতে হয়। সমাজ পরিবর্তনের প্রথম শর্ত হলো কুসংস্কার ভেঙে প্রশ্ন করার মানসিকতা তৈরি করা। একজন আদর্শ শিক্ষক মুক্তচিন্তার বিকাশ ঘটান যা পরবর্তীতে নেতৃত্ব ও বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়ক হয়।
সামাজিক সম্প্রীতি ও বৈষম্য দূরীকরণে জাতি, ধর্ম বা সামাজিক শ্রেণির ঊর্ধ্বে উঠে কীভাবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে হয় তা শ্রেণিকক্ষ থেকেই শুরু হয়। শিক্ষক হলেন সেই প্রজ্ঞাবান পথপ্রদর্শক যিনি সবাইকে সমতার দৃষ্টিভঙ্গি শেখান। দেশাত্মবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতায় দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম জাগ্রত করার মূল দায়িত্বটি শিক্ষকই পালন করেন। ​

ভালোবাসার দীপশিখা: অধ্যাপক বিথিয়া সঞ্চিতা সমাদ্দার: ​শিক্ষকতার এই মহান ব্রত যাঁদের জীবনকে ধন্য করেছে তাঁদেরই একজন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিথিয়া সঞ্চিতা সমাদ্দার ম্যাডাম। বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজের সবুজ প্রাঙ্গণ উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগে ম্যাডামকে প্রথম পেয়েছি। আমি তখন এইচএসসির ছাত্রী। সেদিন থেকে শুরু করে আজও পর্যন্ত নানা বিদ্যাপিঠে আমাদের উভয়ের পেশাজীবনের নানা প্রয়োজনে দেখা হয়েছে কিন্তু এখনো মনে হয় আমি তার সেই এইএসসির ছাত্রী। ঐ শিক্ষা জীবনটুকু ম্যাডাম তার শিক্ষকতা দিয়ে এত প্রভাবশালী করে রেখেছেন যে আমি আজীবন এইএসসিতে পড়ে আছি।  বর্তমানে তিনি দেশের ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে কর্মরত আছেন। এই প্রজ্ঞাবান শিক্ষক তাঁর অসামান্য ব্যক্তিত্ব দিয়ে গড়ে তুলেছেন অজস্র শিক্ষার্থীর জীবন।
​উদ্ভিদ বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্ব, প্রকৃতির সুরক্ষা কিংবা কোষ ও জীবনের সূক্ষ্ম রসায়নের ক্লাসে তিনি কেবল জ্ঞানের আলোই ছড়িয়ে দেননি ছড়িয়ে দিয়েছেন অপরিসীম স্নেহ ও মমতার সুবাস। ম্যাডামের কাছে পৌঁছালে প্রতিটি শিক্ষার্থী অনুভব করে এক অনন্য নিরাপদ আশ্রয়। তাঁকে শুধু একজন 'শিক্ষক' বললে তাঁর বিশালতাকে ছোট করা হয় তিনি শিক্ষার্থীদের জীবনে এক মমতাময়ী মায়ের ছায়া।
​প্রফেসর বিথিয়া সঞ্চিতা সমাদ্দার ম্যাডামের মধ্যে এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে নানা গুণের। তাঁর ব্যক্তিত্ব একদিকে যেমন বলিষ্ঠ ও সম্মানীয় অন্যদিকে তেমনি অনাড়ম্বর ও সততায় উজ্জ্বল। ​মমতা, প্রেম, দয়ায়, কাঠিন্য ও নিয়মানুবর্তিতার মোড়কে লুকিয়ে আছে মায়ের মতো অমলিন স্নেহ। তাঁকে সুরের পাখি বল্লেও ভুল হয় না। সকল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তার সুর আমাদের নদীর মতো বয়ে চলতে শিক্ষা দিতো। গভীর প্রজ্ঞা ও যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি শিক্ষার্থীদের কেবল ভালো ছাত্র হতে শিখাননি, শিখিয়েছেন একজন পরিপূর্ণ ও মানবিক মানুষ হতে। ​দেশপ্রেম ও মানব সেবায় উদ্বুদ্ধ করে তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন আলোর রেণু। ​তাঁর সান্নিধ্যে আসা যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্যই এক পরম সৌভাগ্য ও অহংকারের বিষয়। তাঁর প্রজ্ঞা, সহানুভূতি ও দিকনির্দেশনা প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনে তৈরি করেছে আত্মবিশ্বাস ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস।
​
​সভ্যতা এগিয়ে চলে নতুন স্বপ্নের ওপর ভর করে আর সেই স্বপ্ন রোপণ করেন শিক্ষকবৃন্দ। বিথিয়া সঞ্চিতা সমাদ্দার ম্যাডামের মতো শিক্ষকরা যখন নিজেদের জ্ঞান, স্নেহ ও মেধা দিয়ে শিক্ষার্থী গঠন করেন তখন কেবল একজন ব্যক্তি গঠিত হয় না গড়ে ওঠে একটি সুন্দর সমাজ, একটি সৎ ও প্রগতিশীল জাতি। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে অধ্যাপক বিথিয়া সঞ্চিতা সমাদ্দার ম্যাডামসহ বিশ্বের সকল শিক্ষকের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও অন্তহীন শুভেচ্ছা। তাঁদের রেখে যাওয়া জ্ঞানের আলোতেই আলোকিত হোক আমাদের আগামী।

লেখক : কবি, সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও এমফিল গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।